বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও সুখবর নেই সাংবাদিকদের জন্য

362

তথ্য-প্রযুক্তি আইনের অতিবিতর্কিত ৫৭ ধারা থাকছে না। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’। তবে প্রস্তাবিত আইনেও সাংবাদিকদের জন্য সুখবর নেই। নতুন আইনের খসড়ায় চোখ বুলিয়েছেন এমন অনেকেরই অভিযোগ, ৫৭ ধারাটিকে সামান্য বদলে নতুন আইনের ১৯ নম্বর ধারায় রাখা হচ্ছে। ৫৭ ধারার মতো এখানেও আইনের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফাঁকফোকর রাখা হচ্ছে। অবশ্য আইনমন্ত্রী বলেছেন, নতুন আইনটি যেহেতু এখনো প্রক্রিয়াধীন, এ নিয়ে এ মুহূর্তে সমালোচনার সুযোগ নেই।

সূত্র মতে, আজ রবিবার আইন মন্ত্রণালয়ে এক বিশেষ বৈঠকে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওপর আলোচনা হবে। বর্তমান খসড়াটির ব্যাপারে ঐকমত্য হলে এটি সংসদে তোলা হবে। আজ বিশেষ বৈঠকে আইন প্রতিমন্ত্রী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা থাকবেন বলে জানা যায়। তবে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক খসড়াটি সংশোধনেরই আভাস দিয়েছেন।

যোগাযোগ করা হলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারার সব বিভ্রান্তি দূর করা হবে। বাক্স্বাধীনতার ব্যাপারে যাতে কারো মনে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না থাকে, এ নিয়ে কারো মনে কোনো প্রশ্ন না ওঠে, সেই বিষয়গুলো ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে স্পষ্ট করা হবে। ’ আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের খসড়ায় মন্ত্রিপরিষদ এরই মধ্যে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় এখন আইনটি যাচাই-বাছাই করছে। এ নিয়ে গত ১৫ মে একটি আন্ত মন্ত্রণালয় সভাও হয়েছে। সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে ওই সভায় উপস্থিত সবাই এ আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হন। ’ মন্ত্রী বলেন, ‘আজ (৯ জুলাই) সভায় টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। আমার মনে হয়, সেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটা শেষ খসড়া (ড্রাফট) করার চেষ্টা করব। ’

‘৫৭-এর উনিশ-বিশ’ : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ার ১৯ ধারার (১) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারা মতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানহানি ঘটায় তা হবে একটি অপরাধ। (২) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কোনো কিছু প্রকাশ করে বা সম্প্রচার করে, যা মিথ্যা ও অশ্লীল এবং যা মানুষের মনকে বিকৃত ও দূষিত করে, মর্যাদাহানি ঘটায় বা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে

 তাহলে তা হবে অপরাধ। উপধারা-৩-এ বলা হয়, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা কেউ পাঠ করলে বা দেখলে বা শুনলে তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে তা হবে একটি অপরাধ।

তবে ধর্মীয় ক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রম’ থাকার কথা উল্লেখ করে খসড়ায় বলা হয়েছে, ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকৃত ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত বা ব্যবহূত কোনো পুস্তক, লেখা, অঙ্কন বা চিত্র অথবা যেকোনো উপাসনালয়ের ওপর বা অভ্যন্তরে বা প্রতিমা পরিবর্তনের জন্য ব্যবহূত কোনো ধরনের খোদাই, চিত্র বা প্রতিচিত্র অথবা কোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত কল্পমূর্তির ক্ষেত্রে উপধারা-৩ প্রযোজ্য হবে না।

প্রস্তাবিত আইনটির ২০ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যা পড়লে, দেখলে বা শুনলে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে শত্রুতা বা ঘৃণার ভাব বর্ধন করে বা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে, বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় তাহলে ওই ব্যক্তির অনধিক সাত বছরের কারাদণ্ড, অন্যূন এক বছরের কারাদণ্ড, বা সাত লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

ধারা-১৯-এ অপরাধের শাস্তি এক বছর থেকে দু্ই বছরের জেল। ধারা-১৯ জামিনযোগ্য হলেও ধারা-২০ জামিন অযোগ্য।

৫৭ ধারায় কী আছে : বর্তমানে বহাল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত- ২০১৩)-এর ৫৭ ধারায় বলা হয়, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ফরম বা ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসত্ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন কিংবা যার মাধ্যমে মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এই ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া হয়, তাহলে তা হবে অপরাধ। ’

এ আইনের ধারা-২-এর ৫ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘ইলেকট্রনিক বিন্যাস অর্থ কোনো তথ্যের ক্ষেত্রে কোনো মিডিয়া, ম্যাগনেটিক, অপটিক্যাল, কম্পিউটারে স্মৃতি, মাইক্রোফিল্ম, কম্পিউটারে প্রস্তুতকৃত মাইক্রোচিপ বা অনুরূপ কেনো যন্ত্র বা কৌশলের মাধ্যমে কোনো তথ্য সংরক্ষণ বা প্রস্তুত, গ্রহণ বা প্রেরণ। ’

৫৭ ধারা এবং ইলেকট্রনিক বিন্যাসের সংজ্ঞায় অনলাইন নিউজপোর্টাল বা গণমাধ্যমের কথা সরাসরি উল্লেখ নেই। নেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ায়ও। তবে আইনমন্ত্রী গতকাল আশ্বস্ত করেছেন, ৫৭ ধারার যে বিভ্রান্তি রয়েছে নতুন ডিজিটাল আইনে তা দূর করা হবে। তিনি বলেন, সরকার বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এবং বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে কারো মনে যাতে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব না থাকে সেই ব্যবস্থা সরকার করবে।

সংবাদকর্মীদের বেশি ক্ষতি : পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, পেশাজীবীদের মধ্যে সাংবাদিকরাই ৫৭ ধারার হয়রানির শিকার হচ্ছেন বেশি। সর্বশেষ দৈনিক সকালের খবর পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ও ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সাবেক সহসভাপতি আজমল হক হেলালের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার মামলা হয় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানায়। সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ফেসবুকে শেয়ার করায় তাঁর মানহানি হয়েছে দাবি করে তাঁর পক্ষে মামলাটি করেন ফরাজীর কলেজের প্রভাষক মো. ফারুক হোসেন। গত ৪ জুলাই যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার নাজমুল হোসেন ও তাঁর তিন ফেসবুক বন্ধুর বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করেছেন হযরত আলী বেলাল নামে দিনাজপুরের এক আইনজীবী। বিচারপতির ট্রেনযাত্রা এবং সাধারণ মানুষের ট্রেনযাত্রার তুলনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন নাজমুল।

আইন বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক নেতা ও মানবাধিকারকর্মীরা বলেছেন, সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগ বাড়ছে। ফলে গণমাধ্যমে এক ধরনের চাপা ভীতি কাজ করছে। এমনটি চলতে থাকলে গণমাধ্যমের কণ্ঠ আরো সংকুচিত হবে। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি এবং একুশে টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন যখন প্রণীত হয়, তখনই ৫৭ ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সতর্কতার সঙ্গে ৫৭ ধারা প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু ধারাটির অপব্যবহার হয়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ’ সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সতর্ক থাকতে হবে, যাতে নতুন আইনগুলো পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। তাই সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে  আলোচনা করেই নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে। ’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘৫৭ ধারা যেভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, আমরা উদ্বিগ্ন। গণমাধ্যমে এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির শঙ্কা রয়েছে। ধারাটি মানবাধিকারেরও পরিপন্থী। কমিশন ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সময়। অনেকেই এই আইনে হয়রানির শিকার হচ্ছে। ’ তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও তথ্য-প্রযুক্তি আইন করা হয়। ওই আইনের ৬৬ ধারায় যাকে-তাকে এভাবে হয়রানির স্বীকার হতে হয়। ওই দেশের সুপ্রিম কোর্ট ধারাটি বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করার পর আর ওই ৬৬ ধারা বলবত্ নেই।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সম্প্রতি যে হারে সাংবাদিকদের ৫৭ ধারার আওতায় এনে হয়রানি করা হচ্ছে, তা নজিরবিহীন। তাই গণমাধ্যমেরও উচিত ৫৭ ধারা বাতিলে আরো স্বোচ্চার হওয়া। গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের আচরণ সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের

সর্বশেষ সংবাদ