দ্বিমুখী চাপে পাকিস্তান
মঙ্গলবার, ২১ অগাস্ট ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

দ্বিমুখী চাপে পাকিস্তান

full_1530864659_1444469568_56248_1503614655কাগজে-কলমে এখনও পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। কিন্তু আফগান সংকট নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার যে ভাষায় পাকিস্তানের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, তার নজির খুব একটা চোখে পড়ে না।
তিনি খোলাখুলি হুমকি দিয়েছেন, তালেবানকে নিজেদের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় দেয়া বন্ধ করতে হবে পাকিস্তানকে। তিনি যদি মনে করেন পাকিস্তান তার কথা শুনছে না, তাহলে আমেরিকা কী করবে- সেটা অবশ্য খোলাসা করেননি ট্রাম্প।

তবে মুখে তিনি যেটা বলেছেন তা হল, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ভারতের অধিকতর ভূমিকা দেখতে চায়।

ট্রাম্প হয়তো মনে করছেন, ভারতের ভূমিকা নিয়ে এ বক্তব্য পাকিস্তানের ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি করবে। কিন্তু বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক উপপ্রধান জেনারেল জ্যাক কিন বলেছেন, প্রেসিডেন্ট যেটা মুখে বলেননি তা হল, যদি পাকিস্তান তালেবানের ‘নিরাপদ আশ্রয় শিবিরগুলো’ বন্ধ না করে, তাহলে আমেরিকাকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে।

জেনারেল কিন যেটা ইঙ্গিত করেছেন, তালেবানকে শায়েস্তা করতে পাকিস্তানের ভেতরে সামরিক অভিযান চালাতে পিছপা হবে না যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের এই হুমকির পরদিনই (বুধবার) পাকিস্তানের প্রতি চাপ অব্যাহত রেখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেন, আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্টের নতুন কৌশলকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে পাকিস্তানকে। তা না হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাকিস্তান যে ‘বিশেষ মর্যাদা’ পেয়ে আসছে তা হারাতে হবে।

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানকে তাদের নিজেদের স্বার্থেই ব্যবস্থা নিতে হবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই হুমকির ব্যপারে পাকিস্তান সরকার কড়া জবাব দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, পাকিস্তান তালেবানকে কখনই নিজেদের মাটিতে আশ্রয় দেয় না এবং ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে পাকিস্তান নিন্দা জানাচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ পাকিস্তানের সমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। অনেক সময় পাকিস্তানে চালানো সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা বিদেশে বসে করা হয়। কাজেই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তানের সরকার ও জনগণ যে আত্মত্যাগ করেছে আমেরিকার পক্ষ থেকে তা উপেক্ষা করার মানসিকতা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।’ অন্যদিকে ট্রাম্পের হুশিয়ারির ব্যাপারে বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছে চীন। ইসলামাবাদ সন্ত্রাস মোকাবিলায় সামনের সারিতে রয়েছে বলে ঘোষণা করেছে বেইজিং।

ট্রাম্পের বক্তব্যের পরই এক প্রতিক্রিয়ায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিয়াং বলেন, ‘আমেরিকার নীতি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় শান্তি, সুরক্ষা, স্থিতিশীলতার স্বার্থের সহায়ক হবে আশা করছি। পাকিস্তান সন্ত্রাস প্রতিরোধে সামনের সারিতে আছে, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বহাল রাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।’

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পাকিস্তান এখন কার কথা শুনবে, যুক্তরাষ্ট্রের নাকি প্রতিবেশী দেশ চীনের? বিবিসির এক কূটনৈতিক সংবাদদাতা বলেছেন, পাকিস্তান এখন আমেরিকার ‘আধা মিত্র, আধা সমস্যা।’

কাবুল থেকে বিবিসির অপর এক সংবাদদাতা সন্দেহ প্রকাশ করে বলছেন, এক সময়কার ঘনিষ্ঠ মিত্রের সঙ্গে আমেরিকার দিন দিন দূরত্ব তৈরি হচ্ছে এবং কৌশলগত কারণেই আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাকিস্তান প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ কোটি ডলারের সামরিক সাহায্য পেত। সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে সে সব সাহায্যের অনেকগুলো এখন স্থগিত। জঙ্গিগোষ্ঠী হাক্কানি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ার অভিযোগে চলতি বছর পাকিস্তানকে কোনো সামরিক সাহায্য দেয়া হবে না বলে গত মাসে জানিয়ে দিয়েছে পেন্টাগন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস মার্কিন কংগ্রেসকে এই সিদ্ধান্তের খবর জানান। এর আগে পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্য দেয়ার বিষয়ে কঠোর শর্ত চাপানোর পক্ষে ভোট দিয়েছিল মার্কিন কংগ্রেসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল।

ডন বলেছে, পাকিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। কারণ কয়েক মিলিয়ন ডলার সামরিক সাহায্য তাদের জন্য এখন আর তেমন কিছু নয়। অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের মূল্য এখন ১১০ বিলিয়ন ডলারের। ২০৩০ সালের মধ্যে পাকিস্তানে জ্বালানি, অবকাঠামো ও শিল্প খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চীনা বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে দেশটি বেইজিংয়ের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠবে। এর মধ্যে চলতি বছরের মধ্যেই প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলানের বিনিয়োগ আশা করা হচ্ছে।

লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হচ্ছে, চীনের পক্ষ থেকে দেশটিতে শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ খুব সহজভাবেই আসছে। মাত্র ৯০ কোটি ডলারের জন্য পাকিস্তান মার্কিনিদের সঙ্গে একটা অশান্ত ও প্রেমহীন একটা সম্পর্ক সহ্য করে আসছে। অন্যদিকে চীন তাদেরকে কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিচ্ছে।

সংবাদ শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

BengalTimesNews.com