সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

খনার বচন জানি, খনা কে? জানিনা! আজ জানবো খনার আসল পরিচয়!

images (3)গ্রন্থনা, কামরুল আই রাসেলঃঃ

বিদুষী খানা,গ্রামেগঞ্জে খানার বচন সকলের অত্যন্ত পরিচিত। এখনও কৃষির সাথে সম্পৃক্ত খানার বচন গ্রামে গুরুজনেরা ব্যবহার করে অন্যদের জ্ঞানদান করেন।

আসলে খানা তার কালজয়ী বচনে কৃষি তত্ব জ্ঞান সমাজের সম্মুখে বেদবানীর মতো উপস্থাপিত করেছেন খনার বচনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পরিক্ষা করে দেখা গেছে যে, আধুনিক যুগের কৃষিতত্ত্বও খানার বচনের চেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারেনি।

খনা যে প্রাচীন বাংলাদেশের একজন বিদুষী খ্যাত নামী জ্যোতিষী ছিলেন, সে সম্পর্কে সন্দেহে আর কোন অবকাশ নেই। খানা সম্পর্কে বাংলাও উড়িয়া ভাষায় কিংবদন্তী আছে।

গল্প দুটি প্রায় একরকম। কিন্তু একটি মূল জায়গায় মত পার্থক্য আছে। প্রথমে আমরা গল্পটি সম্পর্কে ধারণা করে নেই তারপর পার্থক্যের দিকগুলো বিবেচনা করবো।

গল্পটি হচ্ছে এরকমঃঃ
খনা লংকা দ্বীপের রাজকুমারী ছিলেন। লংকা দ্বীপবাসী রাক্ষসগণ একদিন স্ববংশে তার পিতা মাতাকে হত্যা করে এবং শিশু খনাকে হস্তগত করে।

একই সময়ে উজ্জয়িনীর মহারাজ বিক্রমাদিত্যের নবরন্ত সভার প্রখ্যাত জ্যোতিষ পন্ডিত বরাহ স্থীয় নবজাত শিশু সন্তানের অকাল মৃত্যুর কথা ভূল গণনাবশত জেনে নবজাতকে একটি তাম্র-পাত্রে রেখে স্রোতে ভাসিয়ে দেন। তিনি মনে করেছিলেন এভাবে শিশুটি মৃত্যু থেকে পরিত্রান পেতে পারে। পরিকক্ত এই শিশুকেও ভাসমান তাম্র-শিশুকে একত্রে পালন করতে থাকে।

খনা ও মিহির কালক্রমে জ্যোতিষ শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জন করেন এবং যৌবনে পরস্পর পরিণয় সুত্রে আবদ্ধ হন। খনা খগোল শাস্ত্রেও শারদশী হয়ে ওঠেন। একদিন খনা ও মিহির গণনায় অবগত হলেন যে, মিহির উজ্জয়নীর সভাপন্ডিত বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহের পুত্র।

এক মাহেন্দ্রক্ষনে উভয়ে রাক্ষস গুরুর অনুমতিক্রমে এবং একজন অনুচরের সহায়তার ভারতবর্ষে যাত্রা করেন। উজ্জয়নীতে এসে খনা ও মিহির পন্ডিত বরাহেগর নিকট আত্মপরিচয় দান করেন। কিন্তু পন্ডিত সে কথা বিশ্বাস করতে চান না। কারন তিনি হণনা দ্বারা জানতে পেরেছিলেন যে এক বছর বয়সের তকার পুত্র মিহিরের মৃত্যু ঘটবে। খনা তখন তার একটি বচন উধৃতি দিয়ে শ্বশুরের ভুল গণনা প্রতিপন্ন করেন-

 কিসের তিথি কিসের বার।
                                                           জন্ম নক্ষত্র কর সার।
                   কি করো শ্বশুর মতিহীন। পলকে আয়ু বারো দিন।
এ গণনায় মিহিরের আয়ু ১০০বৎসর।

পন্ডিত বরাহ সানন্দে খনা ও মিহিরকে স্বগৃহে গ্রহন করেন।
এদিকে পালাবার পর দ্বীপনেতা পলাতক দম্পতিকে ধরার জন্যে আয়োজন করেছিলেন। তখন খনা মিহিরের ওস্তাদ বলেন যে, ওরা জ্যোতিষী গণনা দ্বারা এমন এক অনুকুল মুহুর্তে পলায়ন করেছেন যে, তারা নিরাপদে পৌছে যাবেন।

ফলে অনুসন্ধান পরিত্যক্ত হয়। ক্রমে খনার অগাধ জ্ঞানের কথা জানাজানি হয়ে যায়। রাজসভাতে তিনি আমন্ত্রিতা হন। খনা জ্ঞান গরিমা সভা পন্ডিতদের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাড়ায়। এমনকি তিনি পন্ডিত বরাহের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বহু দুঃসাধ্য।

সমস্যা সমাধান করে দিতে লাগলেন। এতে অপমানিত ও ঈর্ষন্বিত পন্ডিত বরাহ পুত্র বধুকে জিহা কর্তন করে তাকে বোবা বানিয়ে দেয়ার জন্যে পুত্রকে অদেশ করেন। মিহির খনাকে একথা সবিশেষ জানান। খনা এ শাস্তি মেনে নেন।

পিতাদেশে মিহির ছুরিকা দ্বারা খনার জিবহা কর্তন করেন। মাত্রাধিক রক্তক্ষরণে অসামান্যা বিদূষী খনার মৃত্যু হয়।

খনার খন্ডিত জিবহা টিকটিকি ভক্ষন করে করে আগাম ঠিক ঠিক বলার সিদ্দি লাব করেছিল বলে কথিত আছে।

উড়িয়া কিংবাদন্তী অনুযায়ী খনার আসল নাম ছিল লীলাবতী। শ্বশুর বরাহ তার পুত্র মিহির কে আদেশ করেছিলেন পুত্রবধুর জিহা কেটে ফেলতে। খনার জিবহা কর্তন বলে তাই সে খনা বা বোবা।

আসলে লীলাবতী ও খনা একই ব্যক্তি হতে পারেণ। তবে দুটো গল্পেরই সারমর্ম এক খনার মৃত্যুর কারণ ছিল তার অসাধারন প্রজ্ঞা। উড়িয়ে কিংবদন্তী অনুযায়ী পিতার আদেশ পেয়ে নিরুপায় স্বামী মিহির খনার জিহা কর্তনের পুর্বে কিছু কথা বলার সুুযোগ দিয়েছিলেন।

খনা তখন কৃষি আবহ তত্ত্ব জ্যোতিষশাস্ত্রিয় এবং মানব জীবনের বিভিন্ন তিক সম্পর্কে বহুবিধ কথা বলে যান। পরবর্তীকালে সেসব কথা বোবার বচন বা খনার বচন নামে অবিহিত হয়। খনা সিংহলের রাজকুমারী হলেও বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক সুত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন ইতিহাসে।

ফলে খনার ভাষায় বাংলা হওয়া খুব অবাস্তব নয়। তবে খনার বচনের বর্তমান ভাষা মূল ভাষায় বিবর্তিতে রূপ। তার আর্বিভাব কাল সম্পর্কে ধারনা করা যায় সম্ভবত তিন চারি শত বর্ষের মধ্যে হয়েছিল।

খনার সঠিক ইতিহাস কতটা দিতে লিখতে পেরেছি জানিনা, তবে উপমহাদেশে খনা নামের একজন পন্ডিত যে ছিলেন, তাতে আমরা কেউই অমত করতে পারিনা।

খনার কিছু কালজ়য়ি বানী নিম্নরুপঃ-

                                                       তার অর্ধেক তুলা;
                                                        তার অর্ধেক ধান,
                                                         বিনা চাষে পান।
উত্তরঃ(১৬ দিন চাষ করার পর সেই জমিতে মূলা চাষ করলে ভাল জাতের ফলন পাওয়া যায় । তুলা লাগানোর জমিতে ৮ দিন চাষ করতে হবে , ধানের জমিতে ৪ দিন চাষ করে ধান লাগালে ভাল ফলন পাওয়া যায়। পানের জমিতে চাষের প্রয়োজন হয় না ।)

আগে খাবে মায়ে,

                                                          তবে পাবে পোয়ে।

                                                    কলা রুয়ে না কেটো পাত,

তাতেই কাপড়, তাতেই ভাত।
উত্তরঃ(কলাগাছের ফলন শেষে গাছের গোড়া না কাটে যেন কৃষক, কেননা তাতেই সারা বছর ভাত-কাপড় জুটবে তাদের।)

যদি বর্ষে আগুনে,

                                                                রাজা যায় মাগনে।

উত্তরঃ (আগুনে অর্থাৎ অগ্রাণে, আর, মাগুনে মানে ভিক্ষাবৃত্তির কথা বোঝাতে ব্যবহৃত, অর্থাৎ যদি অঘ্রাণে বৃষ্টিপাত হয়, তো, রাজারও ভিক্ষাবৃত্তির দশা, আকাল অবস্থায় পতিত হওয়াকে বোঝায়।)

যদি বর্ষে পুষে,

                                                                 কড়ি হয় তুষে।
উত্তরঃ (অর্থাৎ পৌষে বৃষ্টিপাতের ফলে কৃষক তুষ বেচেও অঢেল টাকাকড়ির বন্দোবস্ত করবে।)

যদি বর্ষে মাঘের শেষ,
                                                           ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।

উত্তরঃ(অর্থাৎ মাঘের শেষের বৃষ্টিপাতে রাজা ও দেশের কল্যাণ।)

খনার এই গুনী বানী এক সময় বাংলার মানুষ খুব মেনে চলতো।এখনকার বাংলায় খনার বচন?

কে, কিভাবে, আমাদের প্রজন্মকে বাংলার আদি ইতিহাস জানাবেন আমি জানিনা। তবে দায়িত্ত কেউকে নিতেই হবে।

সংবাদ শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

BengalTimesNews.com