সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

সিলেটের প্রধান মাদক হাট কাস্টঘর : নিয়ন্ত্রন করছেন যারা

অনলাইন1-5 ডেস্ক : ‘মাদকের হাট’ সিলেটের কাস্টঘর। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মাদক। চোলাই মদের জন্য বিখ্যাত ওই এলাকা। সুইপার কলোনিকে ঘিরেই সব আয়োজন সেখানে। ওই সুইপার কলোনিই পরিণত হয়েছে ক্রাইম জোনে। সন্ধ্যা নামলেই ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয় ওখানে।
নেশার রাজ্যে পরিণত হয় কাস্টঘর। পাশেই বাণিজ্যিক এলাকা মহাজনপট্টি। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে চলে যান। কাস্টঘরের সুইপার কলোনি নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগের অন্ত নেই। এ নিয়ে বহু আন্দোলন, দাবি জানিয়েছিলেন তারা। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ঘুম ভাঙেনি।
বরং নীরবে অনেকেই কাস্টঘরকে শেল্টার দিয়ে যাচ্ছেন। কাস্টঘরের সুইপার কলোনি নিয়ে সম্প্রতি ঘুম ভেঙেছে সিলেট মহানগর পুলিশের। মাদক ও অপরাধ রাজ্য সুইপার কলোনি অপরাধমুক্ত করতে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। বুধবার থেকে পুরো কাস্টঘরে ব্লক রেইড শুরু করেছে। তছনছ করা হয়েছে পুরো ‘মাদকরাজ্য’। এই অভিযান নিয়ে ইতিমধ্যে পুলিশের ভেতরে কিছুটা অস্বস্তিও শুরু হয়েছে।
নিয়মিত অনেকেই কাস্টঘরের অপরাধ আস্তানা থেকে বখরা আদায় করতেন। সিলেট নগরীর বাণিজ্যিক কেন্দ্র বন্দরবাজারের পাশেই মহাজনপট্টি। মহাজনপট্টি সিলেটের অন্যতম পাইকারি বাজার। মহাজনপট্টির মূল সড়ক দিয়ে হাঁটা শুরু করলে খানিক দূরে গিয়েই বামপাশে ছোট একটি গলি। এই গলিই হচ্ছে ‘কাস্টঘর গলি’।
গলির মুখ থেকেই শুরু হয়েছে মাদকের রাজ্য। কাস্টঘরের সুইপার কলোনিতে বসবাস করে সুইপাররা। অনেক আগেই নিরিবিলি ওই এলাকায় সুইপারদের বসবাসের জন্য সরকার থেকেই ঘর বানিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখন সেখানে কয়েকশ’ সুইপারের বসবাস। নিয়ম হচ্ছে সুইপাররা নিজেরা তৈরি করে চোলাই মদ পান করতে পারবেন। তবে সেটি তারা করবেন নিজেদের বাসায়।
বাইরে মদ বিক্রি করা যাবে না। কিংবা বাইরের কাউকে সুইপার কলোনিতে মদ সেবনের সুযোগ দেয়া যাবে না। কিন্তু ওই নিয়ম কেবল খাতাপত্রেই। চোলাই মদ শুধু নয়, সব মাদকের আস্তানা হচ্ছে এটি। চোলাই মদ আছে সেটি খুব কম। এখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ পাওয়া যায়। পাশাপাশি ইয়াবার বড় আড়তে পরিণত হয়েছে সুইপার কলোনি।
আর গাঁজার পাইকারি আস্তানাও। শুধু কলোনিই নয়, বাইরেও কিছু কিছু বাঙালি যুবক মাদক আস্তানা গড়ে তুলেছে। কাস্টঘরের সুইপার কলোনির নামেই তারা এই মাদক আস্তানাগুলো পরিচালনা করেন। সন্ধ্যা নামলেই সুইপার কলোনি সরব হয়ে উঠে। ওই কলোনির প্রতিটি ঘরই যেনো একেকটি মাদক আস্তানা। ছিমছাম পরিপাটি করে সাজানো প্রতিটি ঘরে দামি সোফাসেট, চেয়ার রয়েছে।
পর্দায় আচ্ছাদিত এসব ঘরে ভিড় জমান বাইরে থেকে আসা মাদকসেবীরা। তারা ওইসব ঘরে বসে মধ্যরাত পর্যন্ত নির্বিঘ্নে মাদক সেবন করেন। আর কয়েকটি বিশেষ ঘর রয়েছে যেগুলোতে কেবল সেবন করা হয় ইয়াবা ও হেরোইন। মাদকের নিরাপদ জোন হওয়ায় ইয়াবার বড় চালান পরিচালিত হয় কাস্টঘর থেকে। ইয়াবার ডিলাররা আস্তানার ভেতরে প্রকাশ্যেই খুচরো বিক্রেতাদের কাছে ১০০ থেকে ২০০ পিস করে ইয়াবা বিক্রি করেন।
সিলেট শহরের বন্দরবাজার সহ আশেপাশের ইয়াবা ব্যবসায়ীরা প্রয়োজন মতো সুইপার কলোনি থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করেন। আর এসব ইয়াবায় সয়লাব হয়ে যায় নগরীর অর্ধেক এলাকা। সিলেট নগরীর কয়েকটি মাদক আস্তানায় সন্ধ্যারাতেই ডিলারদের মাধ্যমে মাদক চলে যায় বিভিন্ন আস্তানায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সুইপার কলোনি সন্ধ্যারাতেই সরব হয়ে উঠে।
মহাজনপট্টি এলাকার ব্যবসায়ী ও সিলেট চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক শাহিদুর রহমান মানবজমিনকে জানিয়েছেন, সুইপার কলোনি এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছে যন্ত্রণার নাম। কাস্টঘর থেকে সু্ইপার কলোনি সরিয়ে নিতে ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র সহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
কিন্তু কাজ হচ্ছে না। কাস্টঘরের সুইপার কলোনিকে মাদক ও অপরাধমুক্ত করতে সিলেট মহানগর পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছেন। এই অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মহানগর পুলিশের একজন এডিসি সহ কয়েকজন সাব-ইন্সপেক্টর। গত বুধবার বিকাল থেকে তারা কাস্টঘর এলাকা ঘেরাও করে অভিযান শুরু করেন। অভিযানের আগে তারা এমনভাবে বলয় তৈরি করেন যাতে মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী কেউ পালাতে না পারে। প্রথমদিন রাতভর অভিযানে ১৪ জন মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করা হলেও কোনো মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হয়নি।
পুলিশ ওই মাদকসেবীদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে কাস্টঘরের মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক ডিলারদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে। ইতিমধ্যে পুলিশের কাছে প্রায় ১২ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম এসেছে। এসব মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করছে খোদ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সোর্স।
গ্রেপ্তারকৃত মাদকসেবীদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা দীর্ঘদিন ধরে ওই আস্তানায় যাতায়াত করেন। গ্রেপ্তারকৃত ১৪ মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল তাদের আদালতে সোপর্দ করেন কোতোয়ালি থানার এসআই অনুপ কুমার।এর আগে রাতে গ্রেপ্তারকৃত মাদকসেবীদের ছাড়িয়ে নিতে ও মাদক মামলা থেকে মুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট এসআইয়ের সঙ্গে টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) জেদান আল মুছা গতকাল শুক্রবার জানিয়েছেন, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজনকে ইয়াবা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আর অন্যদের মেট্রো আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তিনি বলেন, কাস্টঘর এলাকায় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চলবে। মাদকমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এবার কাস্টঘরের অভিযান বন্ধ করা হবে না বলে জানান তিনি।
এদিকে গ্রেপ্তারকৃতরা রাতে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক কারবারিদের নাম বলেছে। তাদের মুখ থেকে পাওয়া নাম নিয়ে পুলিশ তালিকা প্রস্তুত করেছে। ওই তালিকায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স আনোয়ারের নাম। আনোয়ারের বাড়ি দক্ষিণ সুরমায়। সে দক্ষিণ সুরমায় ইয়াবার ব্যবসা করে।
আর সুইপার কলোনিতে আনোয়ার ইয়াবা এনে নগরের দক্ষিণ এলাকায় বিক্রি করে। আনোয়ার ইয়াবা এনে সুইপারদের এসিস্ট্যান্ট সর্দার রতন ও বাঘাকে দিয়ে ব্যবসা করায়। রতন ও বাঘার বিরুদ্ধে পুলিশ ওয়ারেন্ট রয়েছে। মাদক মামলায় তারা আসামি হওয়ার পর থেকে ফেরারি রয়েছে।
পুলিশ তাদের খুঁজে না পেলেও কাস্টঘরের সুইপার কলোনিতে বসে তারা নিরাপদে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া মাদক বিক্রেতা সল্টু, পাপ্পু, বিন্দিয়া, কেতলী, উমেন্দ ও সোহাগের নাম পেয়েছে পুলিশ। অভিযানের পর থেকে তালিকায় থাকা মাদক বিক্রেতাদের অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে সোর্স নিয়োগ করেছে বলে জানায় পুলিশ। -মানবজমিন

সংবাদ শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

BengalTimesNews.com