রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন?

images (8)হাবীব রহমান ও ছলিম উল্লাহ মেজবাহ :
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা পদত্যাগ করেছেন বলে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। এ ধরনের তথ্য গতকাল শুক্রবার থেকে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত সিনহার পক্ষে থাকা বিএনপিপন্থি আইনজীবী নেতা ও বিএনপির হাইকমান্ড এ খবরটি পেয়ে হতাশ হয়ে পড়লে পদত্যাগের বিষয়টি আঁচ করা যায়। তবে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক গতকাল শুক্রবার বিকেলে মানবকণ্ঠকে বলেন, অফিসিয়ালি (আনুষ্ঠানিক) এ ধরনের কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।
সরকার কৌশলী হলেও গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে সারাদিন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে এ গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। স্পর্শকাতর এ বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা গোপনীয়তার আশ্রয় নিয়েছেন।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা মানবকণ্ঠকে বলেন, গতকাল শুক্রবার সকালের দিকে দেশের খ্যতনামা এক বিএনপিপন্থী আইনজীবী বিএনপির সাংগঠনিক নীতি নির্ধারণী ফোরামের এক নেতার মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে সিনহার পদত্যাগের বিষয়টি অবহিত করেন। অনানুষ্ঠানিক আলাপে এ নেতা মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘সিনহা পদত্যাগ করছেন, এটা তো ঠিক করলেন না। সরকার ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করিয়েছে।’
প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, আমি বারের সভাপতি হয়ে এ ধরনের পদত্যাগের খবর পাইনি। তিনি পাল্টা এ প্রতিবেদককে প্রশ্ন করে বলেন, আপনি কি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের কপি পেয়েছেন। জয়নুল আরো বলেন, হাওয়ার ওপর ভেসে আসা খবর হচ্ছে গুজব।
জানা যায়, সিনহার পদত্যাগের খবর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে আসার পর বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছেন তারা। তবে দলের নেতারা অনেক হতাশ। অপেক্ষা করছেন সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার। সিনহাকে ইস্যু করে রাজনীতির মাঠ গরম করছিলেন বিএনপি নেতারা। হঠাৎ এমন খবরে দলটির হাইকমান্ডে হতাশার ছাপ দেখা গেছে গতকাল।
আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এমন পদত্যাগের বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলেই দেখছেন। এক নেতা বলেন, এস কে সিনহা পদত্যাগ না করলে তাকে সাংবিধানিকভাবে ইমপিচ (অপসারণ) করা হতে পারে।
সূত্র জানায়, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা কানাডা যাচ্ছেন। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে তিনি আজ-কালের মধ্যে কানাডার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। কানাডায় প্রধান বিচারপতি সিনহার কনিষ্ঠ কন্যা বসবাস করেন।
প্রথমে অস্ট্রেলিয়া গেলেও প্রধান বিচারপতি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে আসেন। সেখানে চারদিন চিকিৎসা গ্রহণ শেষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তিনি দেশে না ফিরে কানাডার উদ্দেশ্যে রওনা দেন বলে জানা গেছে।
প্রধান বিচারপতির পারিবারের একটি সূত্র জানিয়েছে, যেহেতু দুর্নীতি ও অনিয়মসহ ১১টি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তাই তিনি হয়তো এখনই দেশে ফিরছেন না। তিনি পদত্যাগপত্র পাঠাতে পারেন।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার মুখে থাকা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ছুটি গতকাল শুক্রবার শেষ হলেও তার দেশে ফেরার বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেনি সুপ্রিম কোর্ট। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেছেন, প্রধান বিচারপতির দেশে ফেরা বা ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য তার কাছে নেই। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বরাবরই বলে আসছেন, আপিল বিভাগের অন্য বিচারকরা যেখানে ‘চান না’, সেখানে প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ফেরার খুব বেশি সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
বিচারপতি সিনহা শেষ অফিস করেন সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শুরুর আগে ২৪ আগস্ট। ৩ অক্টোবর আদালত খোলার আগের দিন সরকারের তরফ থেকে তার ছুটিতে যাওয়ার কথা জানানো হয়। এরপর ১৩ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন তিনি।
তার আগে আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ছুটিতে প্রধান বিচারপতির বিদেশে অবস্থানের সময়ে, অর্থাৎ ১০ নভেম্বর পর্যন্ত, অথবা তিনি ‘দায়িত্বে না ফেরা পর্যন্ত’ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা প্রধান বিচারপতির কার্যভার সম্পাদন করবেন।
২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পাওয়া বিচারপতি সিনহার চাকরির মেয়াদ রয়েছে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। সংবিধান অনুযায়ী পদত্যাগ না করলে বা অপসারণ না করা হলে ওই সময় পর্যন্ত তিনিই বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি থাকবেন।
৩৯ দিনের দীর্ঘ ছুটি শেষে বিচারপতি সিনহা কবে দায়িত্বে ফিরছেন জানতে যোগাযোগ করা হলে সুপ্রিম কোর্টের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল জাকির হোসেন গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে উনার (প্রধান বিচারপতি) ছুটির বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য নেই। তিনি যদি ছুটি বাড়িয়ে না নেন বা কিছু না জানান, তাহলে চলতি ছুটির পর তা অনুপস্থিতি হিসেবে গণ্য হবে।
এক্ষেত্রে সাংবিধানিক কোনো জটিলতা ঘটবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, একেবারেই না, এক্ষেত্রে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা নেবেন। সেখানে ‘অনুপস্থিতির’ বিষয়টি বলা আছে।
সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দিয়ে থাকেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম বলেন, আমি শুধু এতটুকু জানি যে, উনার পক্ষে আদালতে ফিরে এসে এজলাসে বসে কাজ করা সুদূর পরাহত।
বিচারপতি সিনহা বাদে আপিল বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা বর্তমানে পাঁচজন। নৈতিক স্খলন ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে প্রধান বিচারপতির ‘গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা’ না পাওয়ায় তার সঙ্গে এজলাসে বসতে অপর বিচারকরা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে সুপ্রিম কোর্টের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
আগস্টের শুরুতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর থেকেই ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার মুখে ছিলেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। সংবিধানের ওই সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু রায়ে তা বাতিল করে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে আনে সুপ্রিম কোর্ট।
সাত বিচারপতির ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেয়া ৭৯৯ পৃষ্ঠার ওই রায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নিজের পর্যবেক্ষণের অংশে দেশের রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি, সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা করেন।
ওই রায় এবং পর্যবেক্ষণ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে ‘খাটো করা হয়েছে’ অভিযোগ তুলে বিচারপতি সিনহার পদত্যাগের দাবি তোলেন ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা।
তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে প্রধান বিচারপতি ৩ অক্টোবর থেকে ছুটিতে যান। তিনি দায়িত্বে না ফেরা পর্যন্ত আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির কার্যভার দেয়া হয়। প্রধান বিচারপতিকে ‘জোর করে’ ছুটিতে পাঠানো হয়েছে- বিএনপির এমন অভিযোগের মধ্যেই ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন বিচারপতি সিনহা। ১৮ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে, তার অনুসন্ধান হবে এবং তা দুদকের মাধ্যমে করা হতে পারে।

সংবাদ শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

BengalTimesNews.com