রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ পৌষ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

সিনহা অধ্যায়ের সমাপ্তি

sinha-h-cসিঙ্গাপুর হাইকমিশনের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র বঙ্গভবনে : প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন ওয়াহ্হাব মিঞা
হাবীব রহমান :
ঘটন-অঘটন ও রহস্যের অবসান। শেষ হলো সিনহা অধ্যায়। ছুটি নিয়ে বিদেশ গিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠালেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এনিয়ে ২১ জন প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করলেও পদত্যাগের ঘটনা এটাই প্রথম। ফলে রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের একটির প্রধান ব্যক্তির এই পদত্যাগ ৪৭ বছরের বাংলাদেশকে নতুন একটি অভিজ্ঞতার মুখে দাঁড় করাল। এক হাজারের বেশি দিন দায়িত্ব পালনের পর মেয়াদ শেষের তিন মাস আগে বিদায় নিলেন তিনি। উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নেয়া অবৈধ ঘোষণার যে রায় নিয়ে এই ঘটনার শুরু, সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু করেছে সরকার। তার মধ্যেই সরে গেলেন বিচারপতি সিনহা।
মানবকণ্ঠ গতকাল শনিবারই প্রধান বিচারপতি সিনহার পদত্যাগের খবর প্রকাশ করে। ব্যাপক আলোচনার মধ্যে বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে শনিবার দুপুরে বিচারপতি সিনহার পদত্যাগপত্র পাওয়ার কথা জানানো হয়। দুপুর ১টায় রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, উনার পদত্যাগপত্র আজই (গতকাল) বঙ্গভবনে এসেছে। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ চেয়ে এসকে সিনহার আবেদনটি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পৌঁছেছে। সিঙ্গাপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে এই আবেদনপত্রটি বঙ্গভবনে পৌঁছায়।
২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেয়ার আগেই যুদ্ধাপরাধের একটি মামলার শুনানিতে একাত্তরে নিজের শান্তি কমিটির সদস্য থাকার কথা তুলে ধরে আলোচনায় আসেন বিচারপতি সিনহা; তবে তিনি বলেছিলেন, শান্তি কমিটির সদস্যের ছদ্মাবরণে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছিলেন তিনি।
প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়ে বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করার অভিযোগ নানা সময় তুলে আলোচনার জš§ দেন তিনি। নি¤œ আদালতের বিচারক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন নিয়ে তার সঙ্গে সরকারের বিরোধ হয় আলোচিত। অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মী বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তার বাদানুবাদ বিচারাঙ্গন ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ ছড়িয়েছিল।
এরপর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ভাস্কর্য স্থাপন নিয়েও সরকারের সঙ্গে টানাপড়েন চলে বিচারপতি সিনহার। তার শেষ বিতর্কের শুরু সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে, যা প্রথমে ছুটি এবং শেষে পদত্যাগে গিয়ে শেষ হলো।
চলতি ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের রায় প্রকাশের পর থেকেই ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় ছিলেন বিচারপতি সিনহা। পরের মাসে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর তাতে বিচারপতি সিনহার ৪০০ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ দেখে শুরু হয় ব্যাপক বিতর্ক। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমানে আইন কমিশনের সদস্য বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকও বলেন, এই রায় ‘ভ্রমাত্মক’। ওই পর্যবেক্ষণে সংসদ ও সরকার এবং জাতির জনককে খাটো করা হয়েছে অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগের দাবি তোলেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা; তবে বিএনপি প্রধান বিচারপতির পক্ষেই দাঁড়িয়েছিল।
সংসদে আলোচনা এবং তীব্র আক্রমণের প্রেক্ষাপটে খবর আসে প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাওয়ার। নানা নাটকীয়তার মধ্যে ৩৯ দিন ছুটি নিয়ে ১৩ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ায় বড় মেয়ের কাছে যান বিচারপতি সিনহা। বিচারপতি সিনহা ছুটিতে যাওয়ার পর আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার দেন রাষ্ট্রপ্রধান মো. আবদুল হামিদ।
এখন বিচারপতি সিনহা পদত্যাগ করায় নতুন করে কাউকে প্রধান বিচারপতির শপথ না পড়ানো পর্যন্ত সংবিধান অনুসরণ করে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞাই ওই দায়িত্ব পালন করে যাবেন বলে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন।
বিচারপতি সিনহা ছুটি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ ওঠার কথা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। সর্বোচ্চ আদালত জানান, ওইসব অভিযোগের ‘গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা’ তিনি না দিতে পারায় সহকর্মীরা তার সঙ্গে এজলাসে বসতে নারাজ। এর পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলে আসছিলেন, সহকর্মীরা বসতে না চাওয়ায় এসকে সিনহার প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ফেরা ‘সুদূর পরাহত’। বিচারপতি সিনহা অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পর বিএনপি অভিযোগ করেছিল, তাকে জোর করে ছুটি দিয়ে বিদেশ পাঠানো হয়েছে। পদত্যাগের পরও বিএনপি নেতা মওদুদ বলেছেন, বিচারপতি সিনহাকে পদত্যাগ করানো হয়েছে। ছুটি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার আগে বিচারপতি সিনহা বাধ্য হওয়ার কথা অস্বীকার করলেও তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের আচরণে তিনি বিব্রত, শঙ্কিত।
অন্যদিকে জোর খাটানোর অভিযোগ নাকচ করে আসা আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন, বিদেশ থেকে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন, সেখানে আমরা তাকে জোর করব কোত্থেকে? ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেন, পাঁচ বিচারপতি যেখানে সিনহা সাহেবকে অনাস্থা দিয়েছেন, সেখানে সরকারের কী দোষ?
দায়িত্ব পালন করবেন আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা: সংবিধান অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞাই এখন প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। শনিবার বিকেলে গুলশানে তার নিজ বাসায় সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
প্রধান বিচারপতির পদত্যাগে কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না দেয়া পর্যন্ত দায়িত্বরত প্রধান বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞাই দায়িত্ব পালন করে যাবেন।’
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দায়িত্বে আছেন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা। প্রধান বিচারপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার পরও যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নতুন একজনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না দিচ্ছেন, ৯৭ অনুচ্ছেদ বলে ততক্ষণ পর্যন্ত অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি থাকবেন মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা।
আইনমন্ত্রী বলেন, পদ যদি শূন্যও হয়ে থাকে, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রয়োগ করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাজ হবে, কোনো শূন্যতার সৃষ্টি হয়নি। পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
এসকে সিনহা ছুটি নেয়ায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পান আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা। পরে প্রধান বিচারপতি সিনহা ১৩ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বিদেশে অবস্থান করতে চান- বিষয়টি উল্লেখ করে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১০ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির কাছে একটি চিঠি পাঠান।
১২ অক্টোবর আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিদেশে অবস্থানকালীন বা তার কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা।
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার পর প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হয়েছে কি-না জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানের ৯৫, ৯৬, ৯৭ অনুচ্ছেদ একযোগে পড়তে হবে। পদ যদি শূন্যও হয়ে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত মহামান্য রাষ্ট্রপতি ৯৫ অনুচ্ছেদের যে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা তার সেটি প্রয়োগ না করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ৯৭ অনুচ্ছেদে যা লেখা আছে সেটা সেভাবে কাজ করবে। কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি।’
সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বলা আছে যে, প্রধান বিচারপতি যদি অনুপস্থিত, অসুস্থ বা অন্য কোনো কারণে তার কার্যভার পালন করতে না পারেন, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে বর্তমানে প্রধান বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা বয়োজ্যেষ্ঠ বিচারপতি। তিনি ২০১৮ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত চাকরিতে বহাল আছেন।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গৃহীত হওয়ার পর দেশের পরবর্তী প্রধান বিচারপতি কে হবেন তা রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ করবেন বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের বিষয়টি শুনেছি। এখন নিয়ম হচ্ছে, সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতিই নির্ধারণ করবেন কে হবেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি।

সংবাদ শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

BengalTimesNews.com