এতিমের হক বঞ্চিতকারীর জান্নাত হারাম
মঙ্গলবার, ২১ অগাস্ট ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

এতিমের হক বঞ্চিতকারীর জান্নাত হারাম

unnamed (3)এতিমের হক আদায়ের বিষয়টিতে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এতিমের সম্পদে অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের জন্য ভীষণ শাস্তির হুমকি দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় যারা এতিমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তো
তাদের পেটে আগুন ঢুকাচ্ছে, আর অচিরেই তারা প্রজ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে। (সূরা নিসা : ১০)

রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, সাবধান! যদি এতিমের সম্পদ হস্তগত হয় তাহলে ওই সম্পদ ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে। এমন যেন না হয় যে জাকাত দিতে দিতে তার সম্পত্তি শেষ হয়ে যায়। এই মর্মে হযরত উমর (রা.) থেকেও একটি উদ্ধৃতি বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, তোমরা এতিমের মাল ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে, যেন জাকাত তার সম্পদ নিঃশেষ করতে না পারে। 

ইবনে জারির (রহ.) বলেন, এতিমের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারী কিয়ামতের দিন এ অবস্থায় উত্থিত হবে যে, তার পেটের ভেতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা মুখ, দুই কান, নাক ও দুই চোখ দিয়ে বের হতে থাকবে। যে তাকে দেখবে সে চিনতে পারবে যে, এ হচ্ছে এতিমের মাল ভক্ষণকারী। (ইবনে কাসীর)
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন এক সমপ্রদায় নিজ নিজ কবর হতে এ অবস্থায় উত্থিত হবে যে, তাদের মুখ থেকে আগুনের উদগীরণ প্রকাশিত হতে থাকবে। সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এরা কারা? তিনি বললেন: তোমরা কি লক্ষ্য করনি যে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তাদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ভক্ষণ করে না। (ইবনে কাসীর)
আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করিম বর্ণনা করেছেন, যে রাতে আমাকে ভ্রমণ করানো হলো (অর্থাৎ ইসরার রাতে), সেথায় এমন এক সমপ্রদায়কে দেখলাম তাদের রয়েছে উটের ঠোঁটের ন্যায় ঠোঁট, যারা তাদের দায়িত্বে নিয়োজিত তারা ওই লোকদের মুখের চোয়াল খুলে হাঁ করাচ্ছে তারপর তাদের মুখ দিয়ে আগুনের পাথর ঢুকিয়ে দিচ্ছে, আর সঙ্গে সঙ্গে পাথরগুলো তাদের মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি জিবরাঈলকে বললাম, এরা করা? তিনি বললেন: এরা হচ্ছে এতিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণকারী। (ইবনে কাসীর)
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কারো জমি এক বিঘত পরিমাণ অন্যায়ভাবে দখল করে নেবে, (কিয়ামতের দিন) সাত তবক (স্তর) জমিন তার গলায় লটকে দেয়া হবে।’
ইসলামে এতিমের বয়স পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের ১০টি হকের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ১. এতিমের সম্পদ অন্যদের স্পর্শ করা নিষিদ্ধ, ২. কঠোরতা বা জোর করা নিষিদ্ধ, ৩. মর্যাদার অধিকার, ৪. রূঢ়তা ও দুর্ব্যবহার নিষিদ্ধ, ৫. খাদ্যের অধিকার, ৬. আশ্রয় প্রদানের অধিকার, ৭. বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তরাধিকার সংরক্ষণ, ৮. ইহসানের বা ভালো ব্যবহার করার অধিকার, ৯. ইনসাফের বা ন্যায়বিচারের অধিকার, ১০. ফাইর বা কাফিরদের যে মাল যুদ্ধ ছাড়া হস্তগত হয়। যেমন: খেরাজ, জিযিয়া ইত্যাদি মালের অধিকার।
আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হাবিব, আমাদের নবী হযরত (সা.) মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন এবং ছয় বছর বয়সে মা আমিনাকেও হারান। তারপর তার লালন পালনের দায়িত্ব নিলেন দাদা আব্দুল মুত্তালিব। কিন্তু তিনিও মাত্র দুই বছর পর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। সে হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বদিক দিয়েই এতিম। তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন, তিনি কি আপনাকে এতিমরূপে পাননি? অতঃপর তিনি আপনাকে আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথহারা, অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন। আপনাকে পেয়েছেন নিঃস্ব, অতঃপর অভাবমুক্ত করেছেন। সুতরাং আপনি এতিমের প্রতি কঠোর হবেন না। (সূরা দুহা : ৬-৯)
নবী (সা.) দুধমাতা হালিমা বর্ণনা করেন যে, এতিম হওয়ার কারণে শিশু মুহাম্মদ (সা.) কে লালন পালন করার জন্য কেউ সম্মত হয়নি। আমার উট ছিল দুর্বল তাই আমি সবার শেষে গিয়ে পেঁৗছি। এরপর আর কোনো উপায় না পেয়ে এতিম মুহাম্মদকে গ্রহণ করি। কিন্তু মহান করুণাময়ের অশেষ মেহেরবানীতে আমার উট এমন সবল হলো যে, আমি আমার গোত্রের সবার আগে পেঁৗছে গেলাম। শুধু তাই নয়, আমার স্তনের দুধ, বকরি ও অন্য সব বস্তুতে এই এতিম বালকের কারণে কল্পনাতীত বরকত ও রহমত নাজিল হতে থাকল।’ তাই তাদের প্রতি আল্লাহর করুণা ও রহমত রয়েছে বিধায় পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এতিম প্রতিপালনে বিশেষ ফজিলত বর্ণিত রয়েছে।
সাহল বিন সাদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। তিনি তর্জনী ও মধ্য অঙ্গুলি দিয়ে ইঙ্গিত করলেন এবং এ দুটির মধ্যে ফাঁক করলেন। (বর্ণনায় বুখারি) এ হাদিসে এটাই প্রতীয়মান, যে ব্যক্তি জান্নাতে রাসূল (সা.)-এর সাথি হতে চায় সে যেন এই হাদিসের ওপর আমল করে এবং এতিম প্রতিপালনের প্রতি ব্রতী হয়। সার্বিক দিক থেকে তার প্রতি গুরুত্ব দেয়। কারণ আখিরাতে এর চেয়ে উত্তম আর কোনো স্থান হতে পারে না।
অপর এক হাদিসে রয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি ও এতিম প্রতিপালনকারীর অবস্থান জান্নাতে এই দুই অঙ্গুলির ন্যায় পাশাপাশি হবে। চাই সেই এতিম তার নিজের হোক অথবা অন্যের। (বর্ণনাকারী) মালেক বিন আনাস (রা.) তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করলেন। (সহিহ মুসলিম)
আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, দুর্বল অসহায়দের আবেদনে আমাকে সাহায্য কর। তোমাদের দুর্বল-অসহায়দের কারণেই তোমরা সাহায্য ও রিজিক প্রাপ্ত হও। (আবু দাউদ)
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম বর্ণনা করেছেন, মুসলিমদের ওই বাড়িই সর্বোত্তম; যে বাড়িতে এতিম রয়েছে এবং তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে নিকৃষ্ট ওই বাড়ি; যে বাড়িতে এতিম আছে, অথচ তার সঙ্গে মন্দ আচরণ করা হয়। (ইবনে মাজাহ)
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলের কাছে তার অন্তর কাঠিন্যতার অভিযোগ করল। তিনি তাকে বললেন, যদি তুমি তোমার হৃদয় নরম করতে চাও তাহলে দরিদ্রকে খানা খাওয়াও এবং এতিমের মাথা মুছে দাও। (মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৮৭)

সংবাদ শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

BengalTimesNews.com