খালেদা জিয়াকে বাঁচাতে সনদ জাল করা হয়
মঙ্গলবার, ২১ অগাস্ট ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

খালেদা জিয়াকে বাঁচাতে সনদ জাল করা হয়

images (3)জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও অন্য আসামিদের বাঁচানোর জন্য সনদ জাল করে আদালতে জমা দিয়েছিল আসামিপক্ষ। কুয়েতের আমির জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে অনুদান পাঠিয়েছিলেন বলে ঢাকায় অবস্থিত কুয়েত দূতাবাসের একটি চিঠি এ মামলার বিচার চলাকালে আসামিপক্ষ আদালতে উপস্থাপন করে। তবে ওই চিঠিটি ‘জাল ও সৃজিত’ বলে মত দিয়েছেন বিচারিক আদালত। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান। ১১ দিন পর গত সোমবার বিকেলে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার চলাকালে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেন, কুয়েতের আমিরের পাঠানো টাকা কোনো দিনই প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে আসেনি। ওই টাকা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান আনেন এবং ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ওই টাকাকে দুই ভাগে ভাগ করে জিয়া মেমোরিয়াল অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে হস্তান্তর করেন। এখানে খালেদা জিয়ার কোনো সংশ্নিষ্টতা নেই।

বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এ-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামীয় একটি তহবিল চালু ছিল, যা পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল নামে রূপান্তরিত হয়। ওই এতিম তহবিলের ব্যাংক হিসাব নম্বর-৫৪১৬ এবং তাতে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার জমা হয়। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল কোনো দিনই ছিল না বলে খালেদা জিয়া এবং তার পক্ষে নিয়োজিত কৌঁসুলিরা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সঠিক নয়। তা ছাড়া খালেদা জিয়া ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্যে দাবি করেছেন, ওই টাকা কুয়েতের আমির দিয়েছিলেন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠনের জন্য এবং এ বিষয়ে কুয়েত দূতাবাস থেকে পাঠানো অকাট্য প্রমাণ রয়েছে।

এ যুক্তি খণ্ডন করে বিচারক নথি পর্যালোচনায় বলেন, ২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর খালেদা জিয়ার পক্ষে ওই প্রমাণটি আদালতে দাখিল করা হয়। খালেদা জিয়ার পক্ষে সাক্ষ্য আইনের ৫৭ (৬) ধারার বিধান অনুসারে নোটারিয়াল সার্টিফিকেট এবং কুয়েত দূতাবাসের পাঠানো ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট তারিখে ইস্যু করা চিঠির নোটারাইজড ফটোকপি দাখিল করা হয়েছে।

৬৩২ পৃষ্ঠার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক উল্লেখ করেছেন, কুয়েত দূতাবাসের পাঠানো চিঠি থেকে জানা যায় যে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান এনেছিলেন। তবে তা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে এতিমখানা

খোলার জন্য দেওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি। ওই চিঠিতে শুধু জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এটা থেকে ধরে নেওয়া যায়, এই মামলার খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের বাঁচানোর লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট কুয়েত দূতাবাসের দেওয়া চিঠিটি ‘সৃজন’ (বানানো) করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আসামিপক্ষ ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর ইস্যু করা নোটারি সার্টিফিকেট প্রমাণের জন্য সংশ্নিষ্ট নোটারি পাবলিককে আদালতে আনেনি। তাছাড়া কুয়েত দূতাবাসের সার্টিফিকেটের ফটোকপি সত্যতা প্রমাণের চেষ্টা করা হয়নি। নোটারি ইস্যুকারী ব্যক্তি এবং কুয়েত দূতাবাসের কোনো কর্মকর্তাকে সাফাই সাক্ষী হিসেবে আদালতে উপস্থাপন না করা আসামিপক্ষের দুর্বলতার পরিচয় বহন করে।

রায়ের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে আসে ১৯৯১ সালে। তখন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন হয়নি। দুই বছর পর ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তা গঠন হয়। তাহলে প্রশ্ন এসে যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠনের আগেই কী কুয়েতের আমির ১৯৯১ সালে ওই ট্রাস্টকে অনুদানের টাকা প্রদান করেন?

এ ছাড়া কুয়েত এমবাসির চিঠিটি পড়ে দেখা যায়, সেটা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সম্বোধন করে লেখা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী ওই চিঠি পররাষ্ট্র সচিবকে সম্বোধন করে লেখার কথা। তা না হয়ে মামলায় আসামি খালেদা জিয়ার আইনজীবী মোহাম্মদ আলীকে সম্বোধন করে তা লেখা হয়েছে, এটা বাস্তবসম্মত নয়।

সংবাদ শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

BengalTimesNews.com