বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১১ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

ভূতের বাচ্চা সোলাইমান ও কিছু কথা

unnamed (5)আব্দুল করিম কিম : ইসলামী পরিভাষায় ভূত বলে কোন শব্দ নাই, মানুষ বলেও কোন শব্দ নাই। আছে জ্বীন ও ইনসান। জ্বীন বলতে যা বোঝানো হয় তাকে বাংলায় বলা হয় ভুত। আর আরবিতে যা ইনসান, বাংলায় তা মানুষ। ইসলাম বলে, এই জ্বীন ও ইনসানকে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য। আল্লাহ্ প্রেরিত পুরুষ বা পয়গম্বরদের মাধ্যমে জ্বীন ও ইনসানকে জীবনযাপন করার জন্য বিধিবিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। ইসলামী আক্বিদায় বিশ্বাস করা হয়- প্রায় সোয়া দুই লক্ষ পয়গম্বর মানুষ (ইনসান) ও ভূতের (জ্বীন) জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। এ সকল পয়গম্বরদের পৃথক নাম ছিল কি না তা জানা না গেলেও পবিত্র কোরআন শরীফে লিপিবদ্ধ ২৫ জন পয়গম্বরের প্রত্যেকের নাম পৃথক। সে থেকে ধারণা করে বলা যায়, সোয়া দুই লক্ষ পয়গম্বরের সোয়া দুই লক্ষ নাম ছিল।

পয়গম্বরদের কাজ ছিল জ্বীন ও ইনসানকে আল্লাহর পথে আহবান করা। তাঁদের সে আহবানে কেউ সারা দিত, কেউ দিত না। যারা ধর্মপ্রচারে সফল হতেন তাঁদের নিজ নিজ উম্মত বা অনুসারী গড়ে উঠত। আর সেই অনুসারীরা নিজ নিজ পয়গম্বর বা পূর্ববর্তী পয়গম্বরদের নাম অত্যন্ত সম্মানের সাথে নিজের সন্তানদের জন্য বেছে নিতো। প্রত্যেক মা-বাবার প্রত্যাশা থাকতো নিজের সন্তান সেই পয়গম্বরের গুণের অধিকারী হবে। সে হিসাবে মানুষ ও ভূত যারাই নবী বা পয়গম্বরের অনুসারী হ’ত তাঁরা নিজের সন্তানের নাম পয়গম্বরদের নামে রাখার চেষ্টা করতো।

পবিত্র কোরআন শরীফে পূর্ববর্তী পয়গম্বরদের সম্বন্ধে যে তথ্য বর্ণিত আছে, তা থেকে জানা যায় নবী হজরত সোলায়মান (আঃ) জ্বীন জাতিকে সবচেয়ে বেশী হেদায়েত দান করেছেন। তিনি বিভিন্ন প্রাণীর ভাষাও বুঝতেন। বিভিন্ন প্রানীকেও তাঁর উম্মত করেছেন কি না সেটা জানা না গেলেও তিনি যে জ্বীন বা ভূতদেরকে দলে দলে হেদায়েত করেছেন তা জানা যায়। তিনি জ্বীনদের দিয়েই জেরুজালেমের পবিত্র ‘মসজিদুল আল আকসা’ তৈরি করিয়েছিলেন। যে মসজিদ ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলমান তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র প্রার্থনাগৃহ।

মানুষ ও জ্বীনের মধ্যে ধর্ম প্রচারকারী সেই নবী হজরত সোলায়মান (আঃ)-এর নাম এখনো এই তিন ধর্মের অনুসারী মানুষের কাছে জনপ্রিয়। হিব্রু বাইবেলে সোলায়মান কে বলা হয় ‘সলমন’ (ঝড়ষড়সড়হ)। তাই মুসলমান সমাজে সোলায়মান নামের মানুষ যেমন যত্রতত্র পাওয়া যায় ঠিক তেমনি ইহুদী-খ্রিষ্টান সমাজে ‘সলমন’ (ঝড়ষড়সড়হ) নামটা কমন। নবী হজরত সোলায়মান (আঃ)-এর পিতা হযরত দাউদ (আঃ)-এর নাম বাংলায় তেমন জনপ্রিয় না হলেও ইহুদী-খ্রিষ্টান সমাজে ডেবিড (উধারফ) অত্যন্ত জনপ্রিয় নাম।

মানুষের সমাজের খবর জানা যায় বলে মানুষের বাচ্চাদের নাম আমরা জানতে পারি। ইব্রাহীম, ইসমাইল, ইসহাক, মুসা, হারুন, দাউদ, সুলেমান, জাকারিয়া, আইয়ুব, ইউসুফ, ইউনুস, ইয়াহিয়া, সালেহ, সোয়াইব ইত্যাদি নামের ব্যক্তি আমাদের চেনাজানাদের মধ্যেই বিরাজমান। এই নামগুলো কোরাআন-এ বর্ণিত পয়গম্বরদের নাম। পবিত্র কোরআন শরীফে এই নবী বা পয়গম্বরদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাই মুসলিম সমাজে এ নামগুলোর ব্যাপক প্রচলন । এসব নামের ব্যক্তির অভাব নেই পথে-ঘাটে-হাটে-মাঠে।

বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে ‘ইয়াহিয়া’ নামের এক জঘন্য ব্যক্তির উপস্থিতি ছিল। ইয়াহিয়া নিরস্ত্র বাঙ্গালীকে রাতের আঁধারে ঘুমন্ত রেখে হত্যা করার আদেশ দিয়ে ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের কুখ্যাত সেনানায়ক ইয়াহিয়া আর আল্লাহর নবী হজরত ইয়াহিয়া (আঃ)-কে এক ব্যাক্তি ভাবলে কার কি করার থাকে ? একাত্তরের উন্মাতাল দিনে মিছিলে-মিটিং-এ ‘ইয়াহিয়ার দুই গালে জুতা মারো তালে তালে’ বলাতে একবারো কারো মনে হয়নি এটা নবীর অবমাননা। এখন এই ইয়াহিয়া’ বলতে কেউ যদি সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ দিয়ে মূর্খ মানুষকে বোঝাতে চায় ইয়াহিয়া বলতে আল্লাহর নবীর কথা বলছে বাঙ্গালীরা তাহলে অবমাননা আসলে কে করছে বলে ধরে নেয়া যায়?

আমরা জানি, দাউদ ইবরাহিম নামে দুই দুই জন নবীর নামধারণ করে আছে আন্তর্জাতিক এক অপরাধী। এখন দাউদ-ইব্রাহীমের গল্প লেখা হলে সেটা নবীর গল্প যদি কোন আহাম্মক মনে করে তবে কি করার থাকে ? বাংলাদেশে দুই নবীর নামধারী এক জাতীয় প্রতারক আছে, যে পর্বত আরোহণের নামে জাতিকে প্রতারিত করেছে। মুসা নামের এক অস্ত্র ব্যাবসায়ী আছে যে, বেগানা নারীদের নিজের দেহরক্ষায় নিয়োজিত রাখে। নবীদের নাম নিয়ে দেশ ভর্তি চোর-চ্যাছড়ার বিচরণে নবীদের অবমাননা হয় না। অবমাননা হয়, একজন লেখক তাঁর কল্পনায় যখন ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ বলেন। তখন সেই ভূতের বাচ্চা হয়ে যায় নবী হযরত দাউদ (আঃ)-এর বাচ্চা হজরত সোলায়মান (আঃ)। কি অদ্ভুত আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি ! এখন বলা হবে, এতো নাম থাকতে ভূতের বাচ্চার নাম সোলায়মান কেন ? আরে বাবা ভূত(জ্বীন)রা নবী সোলায়মানের উপর ঈমান এনেছিল সে ইতিহাস লেখকের অজানা থাকার কথা নয়। লেখক জাফর ইকবাল-এর পিতা-মামা উভয়েই অত্যন্ত ধার্মিক । উনাদের মুখে জ্বীনদের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী নবী সোলায়মান (আঃ)-এর গল্প শোনার কথা । সেই হিসাবে এই শিশু-কিশোর উপন্যাস ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’-এর মূল চরিত্র এই ভূতের বাচ্চাকে তাঁর মা-বাবা সোলায়মান রেখে কি অপরাধ করেছেন?

অপরাধ এই নামকরণে নয়। অপরাধ জাফর ইকবালের সাথে অন্য নামকরণ নিয়ে। আর তা হ’ল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম’-এর নামে করার চেষ্টায় প্রফেসর জাফর ইকবাল-এর অগ্রণী ভূমিকা। ‘জাহানারা ইমাম’ একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক নাম। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম-এর আন্দোলনেই কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আজমকে গণআদালতে মৃত্যুদ- দেয়া হয়। স্বাধীনতার দুই দশক পর জাহানারা ইমাম নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিস্মৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আগুন আবার নতুন করে প্রজ্বলন করেন। যে আগুনে একাত্তরের ‘পরাজিত শক্তি’র মূল মানুষেরা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আজও সেই আগুনের দহন চলছে। সেই জাহানারা ইমাম-এর নামে সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নামকরণ করার চেষ্টা থেকেই প্রফেসর জাফর ইকবাল এদের চক্ষুশূল। একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা নানা ভাবে জাফর ইকবাল স্যারকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে গেছে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের ছাত্র সংগঠন দিয়েও নানা ভাবে চেষ্টা করেছে। কিন্তু তিনি দল-মত-নির্বিশেষে সকল সাধারণ শিক্ষার্থীর অত্যন্ত প্রিয় একজন শিক্ষক । তাই স্যারকে শারীরিকভাবে আঘাত করা সম্ভব হয়নি। তবে এরা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায় ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ প্রকাশিত হলে এরা নবী সোলায়মান (আঃ)-এর অবমাননা হচ্ছে বলে বাজার গরম করতে থাকে। বইয়ের প্রচ্ছদে আরবি শেখের জোব্বা পড়া এক খল চরিত্র নিয়ে ত্যানাপ্যাঁচাতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ সাইটে নানান ভাবে মিথ্যাচার চলতে থাকে। কিন্তু বইটি পড়ে নবী অবমাননার কিছু পাওয়া যায় না। তাই ২০১৭ সালে সেই ক্যাচাল বেশিদূর নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। একবছর অপেক্ষার পর একজনকে পাওয়া গেলো। যে বিশ্বাস করে বসে জাফর ইকবাল নাস্তিক এবং তিনি নবী সোলায়মান (আঃ)-এর অবমাননা করেছেন।

নবীর প্রতি ইমান আনা ও সেই মতে শ্রদ্ধা জানানো ইমানের দাবি। সকল সোলায়মানই কি নবী? তা যদি না হয়, তাহলে একটি বইয়ের নামের ক্ষেত্রে সোলায়মান নবীর প্রসঙ্গটাই টেনে আনার চেষ্টা কেন? শিশু উপন্যাস ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ কীভাবে ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের বিপক্ষে গেছে সেই বিবরণ দিয়ে কোন লেখা কি কেউ লিখেছেন?

প্রচ্ছদ নিয়ে ত্যানাপ্যাঁচাতে হয়েছে। প্রচ্ছদে আরবীয় জুব্বা গায়ে দেয়া এক ব্যক্তির ছবি আছে। জুব্বা পরলেই তিনি হুজুর বা হুজুরের প্রতিনিধি হতে যাবেন কেন ? আরব দেশে যারা জুব্বা পরেন, তারা সবাই কি হুজুর বা ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন? মধ্যপ্রাচ্যের শেখরা জুব্বা পরে দেশ-বিদেশে কি কি করেন তা আজকের দিনে কারো অজানা নয়। ছবির লোকটির মাথায় একটি রশি বাঁধা রয়েছে, যা বেদুইনরা পরে। আমাদের দেশের হুজুরেরা জুব্বা ও রুমাল পরলেও রশি পরেন না। তাহলে এটি ধর্মের অবমাননা হয় কী করে? উপরন্তু জুব্বা যে শুধুই আরবীয় মুসলিমদের পোশাক, তা নয়। ইসলামের ঘোরশত্রু আবু জাহাল ও আবু লাহাবও জোব্বা পরে। আরবের ইহুদি ও খ্রিস্টানেরাও জুব্বা পরে। তাই মূল বিষয় ধর্ম অবমাননা নয়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ‘ঘাতক ফয়জুরের’ মত বেকুবদের উত্তেজিত করা। আর নিজেদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া।
(লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাপা সিলেট।)

সংবাদ শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

BengalTimesNews.com