মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

গ্রামীণ ঐতিহ্যে পুরন্দরপুর উন্নয়নে হয়ে উঠুক ভরপুর…… পিযুষ চক্রবর্তী (নন্টু)

Untitled-1 copyগ্রাম প্রধান দেশ। পুরন্দপুর গ্রাম সহ স্বাধীনতা উত্তর ৫৬ হাজার গ্রামের বাংলাদেশ। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের নদী ও হাওর ঘেরা একটি গ্রামের নাম পুরন্দরপুর (কুরধনপুর)। প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, গ্রামটি বৃটিশ শাসনামলের ও পূর্বে কথিত কালীদয় সাগরের পাদদেশে অবস্থিত। হাওর অঞ্চলের ধান, মাছ ও সহজ-সরল জন-জীবন নিয়ে গড়ে উঠে গ্রামটি। শত পরিবারের আবালবৃদ্ধ বনিতা নিয়ে প্রায় ৫’শ জনের একটি নিবৃত্ত পল্লী। গ্রামটি পিয়াইন নদী তীরবর্তী পূর্ব-পশ্চিমে দণ্ডায়মান। গ্রামের দক্ষিণে রয়েছে এক অতি সুপরিচিত কালিয়াগুটা হাওর ও শাল্লা থানার এলাকা এবং উত্তরে রয়েছে পাগনা (পাকনা) হাওর এবং জামালগঞ্জ থানা এলাকা। পশ্চিমে রয়েছে নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুড়ি থানার এলাকা। পূর্বে রয়েছে পাশ্বর্তী গ্রাম বলনপুর ও পাশ্বর্তী থানা দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। পুরন্দরপুর গ্রামে রয়েছে গ্রামীন ঐতিহ্যপূর্ণ দৃশ্যপট। যেখানে আধুনিকতার ও উন্নয়নের ছোঁয়া এখনও পর্যন্ত লাগেনি বললেই চলে। অথচ দিরাই-শাল্লা-সুনামগঞ্জ-২ আসনটি ছিল বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান ও সাবেক রেলওয়ে মন্ত্রীর এলাকা। দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সংসদ সদস্যের কাছ থেকে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধানে গ্রামটি সহ এলাকাবাসী আশানুরূপ উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। পুরন্দরপুরে রয়েছে শত বছরের শিব এর গাছতলা এবং প্রায় শত বছরের একটি পুরাতন প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি এখন গতানুগতিকভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ে ৪ জন শিক্ষকের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ২জন শিক্ষক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এখানে কয়েক বছর যাবত প্রধান শিক্ষকের পদ শূণ্য রয়েছে। এতো পুরাতন বিদ্যালয় ও পাশ্ববর্তী আলীপুর ও দুর্লভপুর গ্রামের ছাত্র-ছাত্রীরা বিদালয়ে পড়াশোনা করে আসছে দীর্ঘকাল ব্যাপী। বিদ্যালয়টির মান ও গুণগত দিক লক্ষণীয় হওয়া উচিত ছিল। এছাড়া বিদ্যালয়টিতে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ পৌঁছায় নি। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রয়েছে শৌচাগারের অব্যবস্থাপনা। এমনকি খাবার পানির জন্য নেই কোন টিউবওয়েল। গ্রামের মানুষ রাজনীতি সম্পর্কে অতশত বুঝে না। দলের চেয়ে ব্যক্তি বিশেষের গুরুত্ব মনে করেছে বেশি। উপজেলা দিরাইয়ের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন চৌধুরীর নিকট পুরন্দরপুর গ্রামবাসী আব্দার করেছিল আমাদের শিবের গাছতলাটি পাকা করে দিতে হবে এবং একটি শ্বশ্মান ঘাট করে দিতে হবে। গ্রামবাসীর কথামত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন চৌধুরী পুরন্দরপুর গ্রামবাসীকে তা করে দিয়েছিলেন। একমাত্র ব্যুরো ফসল, নদী ও হাওরের মৎস্য সম্পদ নিয়ে গ্রামীন জনপদের জীবনমান চলে। হাওর অধ্যূষিত গ্রাম পুরন্দরপুরে বার মাসে তেরো পার্বন পালন সহ বৈশাখ মাসে নবান্ন উৎসব পালন করে গ্রামবাসী। কারণ একমাত্র ফসল ঘরে উঠে বৈশাখ মাসে। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের হাওর এলাকা তথা পুরন্দরপুর গ্রামবাসীর কাজের ধরন ও মনের পরিবর্তন হয়। হাওরের যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই মৌসুমী ব্যুরো ফসল সোনালী ধানে মৌ মৌ গন্ধে পুরন্দরপুর গ্রাম তথা এলাকার চারদিকে কৃষক-কৃষানী সহ আবালবৃদ্ধ বনিতার উৎসব মুখর ধান কাটা শুরু হয় বছরের প্রথম মাস বৈশাখে। আর এই ধান ঘরে তুলতে পরিবারের সব সদস্যদের কাজ করতে হয় ধান কাটা থেকে শুরু করে মাড়াই করা, ধান শুকানো, খড় শুকানো সহ গুলায় ধান তোলা পর্যন্ত। যা নিজে না করলে এমনকি নিজের চোখে না দেখলে এমন আনন্দ ও ঘাম ঝড়া কষ্টকর পরিবেশে বাস্তব প্রেক্ষাপট অবিশ্বাস্য মনে হবে। একটিমাত্র ফসল ঘরে তুলতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় সহ শ্রমিক সংকটের মত পরিস্থিতির মোকাবেলা করেও ফসল ঘরে তুলতে পারলে গ্রামবাসী তথা হাওরবাসীর জীবনমান রক্ষা হয়। উৎসব মুখর পরিবেশে ধান গোলায় তোলা শেষ হতে না হতেই আম-কাঁঠালের আনন্দ চলে আসে মানুষের মনে। বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা গ্রামে গ্রামে নৌকাযুগে আম-কাঁঠাল নিয়ে আসেন। গ্রামের মানুষ ধানের বিনিময়ে আম-কাঁঠাল ক্রয় করে আনন্দ ভোগ করেন। অপর দিকে ধান ব্যবসায়ীরা ভৈরব-আশুগঞ্জ থেকে বড় বড় নৌকা নিয়ে হাওর অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে ধান ক্রয় করে প্রচুর লাভবান হচ্ছে। কিন্তু সেই হাজার হাজার মণ ধানের উৎপাদনস্থল হচ্ছে হাওর এলাকা তথা পুরন্দরপুর গ্রামবাসী। অথচ ধান উৎপাদনকারী কৃষকরা ধান উৎপাদনে যা ব্যয় করেন, প্রথম দিকে প্রয়োজনের তাগিদে অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে ৫’শ টাকা প্রতি মণ ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। অথচ প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ হয় ৭’শ টাকার মতো। হাওর অঞ্চল তথা পুরন্দরপুর গ্রামবাসীর একমাত্র আয়ের ভরসা হচ্ছে মৌসুমী ব্যুরো ধান। ফসল উঠার সাথে সাথে গ্রামবাসীদের মনে আনন্দের ক্ষেত্র তৈরি হয় বিভিন্নভাবে। যেমন- ফুটবল খেলা, কাবাডি খেলা, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, তাশ খেলা, দাবা খেলা এবং মহিলাদের কড়ি খেলা, পুঁথি পড়া প্রভৃতি। ইদানিং মানুষ এসব আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফসল ঘরে তোলার পর পরই বাড়তি উপার্জনের জন্য ছুটে চলে শহরপানে। শুরু হয় বর্ষাকাল। চারদিক জলমগ্ন হয়ে উঠে। হাওরগুলোতে ১৫ থেকে ২০ ফুট উঁচু পানি হয়। আবহওয়া ও জলবায়ুগত কারণে যদিও ১২ বছর যাবত পানি কিছুটা কম হয়। তথাপি পানিবন্দি হয়ে পড়ে পুরন্দরপুর গ্রামবাসী তথা হাওর বেষ্টিত এলাকাবাসী। জনমতে দেখা দেয় স্থবিরতা ও কর্মহীনতার কিছু কুফল। কথায় আছে অলস মস্তিস্ক শয়তানের কারখানা। উঠতি বয়সের যুবক-যুবতিরা অলস সময় কাটায়, নেশাগ্রস্থ হয়, বাজে আড্ডা দেয়, অনৈতিক কার্যকলাপের ফাঁদে পা বাড়ায়। যদি স্থানীয়ভাবে হাওর এলাকায় সরকারিভাবে গ্রামীন শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হতো তবে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হতো অলস সময় কাটাতে হতো না এবং ব্যক্তি, পরিবার তথা জাতীয় অর্থনীতিতে উন্নতির সহায়ক হিসেবে কাজে আসতো। পানির সাথে মিতালী করে হাওরবাসী বিয়ে-সাদীর কাজটি নৌকা ও ট্রলারযোগে সাড়তে চায়। কারন যোগাযোগের একমাত্র বাহন ইঞ্জিন চালিত নৌকা। পানির সাথে হারওবাসী জেলেদের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। পানি আসলেই জেলেরা মাছ ধরার কাজটি শুরু করে এবং স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বরফের বক্সে করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বা শহর এলাকায় মাছ সরবরাহ করে। পুরন্দরপুর গ্রামবাসী ও হাওর এলাকার মানুষ ভৌগোলিক পরিস্থির কারণে বর্ষা মৌসুমে অলস সময় কাটালেও কার্তিক মাসে চলে আসে ধানের বীজ বপনের প্রস্তুতি ও নতুন ফসল ফলানোর চিন্তাধারা। সময় গতিশীল প্রকৃতি ও মানুষের মন পরিবর্তনশীল।
গ্রামাঞ্চলে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা ও মূল্যায়ন অপেক্ষাকৃত কম এবং ভৌগোলিক কারনে অনিচ্ছাকৃত কর্মবিমুখ থাকতে হয় আবালবৃদ্ধ বনিতাকে। যা ব্যক্তি পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত ও পরিশ্রমী সে জাতি তত বেশি উন্নত। আমাদের এই দেশ আয়তনের তুলনায় জনাধিক্য। আর এই জনাধিক্য দেশকে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে। ভৌগলিক কারনে গ্রামবাসী তথা হাওরবাসীর পরিশ্রম করার মতো কর্মক্ষেত্র নেই। নেই যথাথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা। উন্নয়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ এখানে গ্রামীণ পরিসরে পুরন্দরপুরবাসী স্থবির জীবন-যাপন ও অনুন্নত জীবনমান কাটাচ্ছে। এছাড়া চিকিৎসা ও বিনোদন সহ সুষ্ঠু ও মৌলিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত কি রয়েছে তৃণমূল তথা আবহমান গ্রাম বাংলার পল্লী প্রান্তরে, একবাক্যে বলা যাবে না। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে কৃষক-মজুর, জেলে, শ্রমিক সহ সকল শ্রেণীর সাধারণ জনতাও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। জীবন বাজি রেখে হতাহতের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলো সব শ্রেণীর মুক্তিযোদ্ধা। পুরন্দপুর গ্রামেও মুক্তিকামী মানুষের সংখ্যা কম ছিল না। কৃষি প্রধান দেশ এখনও শতকরা ৭৫% ভাগ মানুষ সারা দেশে কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত। আর হাওর অধ্যূষিত পুরন্দরপুর গ্রামে তো কথাই নেই প্রায় শতভাগ মানুষ কৃষিজীবী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গ্রাম ও কৃষি প্রধান দেশে কৃষকের অন্তহীন দুর্দশা ও ভাবনা। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রত্যাশিত ও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হওয়া চাই। পল্লীপ্রান্তর সহ তৃণমূলের সাধারণ জনগণের মতো পুরন্দরপুর গ্রামবাসী আধুনিক সুযোগ সুবিধা পেতে চায়, গ্রামকে একটি আদর্শ গ্রামে পরিণত করতে চায়। সাথে সাথে জীবনমান উন্নত করতে চায়। আমার গ্রাম পুরন্দরপুর শুকনো মৌসুমে দেখতে নদী ঘেরা দ্বীপের মতো নিথর এবং বর্ষায় জলমগ্ন থাকে যা সময়োপযোগী অনুসারে এভাবে মানুষ চলতে পারে না। চিকিৎসা, শিক্ষা, বিনোদন, কর্মক্ষেত্র উন্নত যোগাযোগ সহ সার্বিক দিক দিয়ে মানুষ সুবিধা ভোগ করতে চায় এবং চায় জীবনমান উন্নত করতে। গ্রামকে কেন্দ্র করেই শহরের উদ্ভব। আর এই শহরের প্রভাবে গ্রাম দিন দিন নিরস হয়ে উঠছে। কারণ একটু অপেক্ষাকৃত সচেতন ও সুবিধাভোগীরা ছেলে-মেয়ে নিয়ে শহরে চলে আসছে। এতে গ্রামে অন্যায়, অবিচার বাড়ছে এবং গ্রামীন পরিসরে সুস্থ্য পরিবেশ দুস্কর হয়ে পড়ছে। গ্রামীন জীবনে উন্নতি সাধন ঘটাতে সরকারিভাবে যথাযথ কাজের মাধ্যমে উন্নতি হওয়া চাই। উপজেলা দিরাইয়ের সাথে পুরন্দরপুর গ্রামের উন্নত ও অডুবন্ত সড়ক যোগাযোগ চাই। উপজেলার ১নং ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের পুরন্দরপুর গ্রামের প্রায় শতবর্ষের প্রাইমারী স্কুলটিকে হাই স্কুলে উন্নীত করা হোক এবং ওয়ার্ডের মানুষের জন্য একটি চিকিৎসালয় তৈরি করে দেওয়া হোক, যাতে সর্বশ্রেণীর মানুষ সরকারিভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে পারে। এলাকার যুব সমাজকে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যরতার হাত থেকে মুক্ত করতে এমনকি কৃষক ও জেলে সহ সবার কর্মসংস্থানের জন্য ওয়ার্ড ভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হোক। এতে স্থানীয়ভাবে আয়ের উৎস বৃদ্ধি পাবে ও জাতীয় অর্থনীতিকে প্রসার করতে অবদান রাখবে। পল্লী প্রান্তরের হাওর অধ্যূষিত পুরন্দরপুর গ্রামটি (কুরধনপুর) স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সুদৃষ্টি ও সরকারি সুব্যবস্থাপনায় উত্তরোত্তর উন্নতিতে সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক এটাই প্রত্যাশা।

সংবাদ শেয়ার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

BengalTimesNews.com