মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

ভ্রমণঃ টাক্সগুয়ার হাওর-পাখিদের এক স্বর্গরাজ্য………… জ্যোতিষ মজুমদার

টাক্সগুয়া20171227_164458-1র হাওর বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত একটি হাওর । প্রায় ১০০ বর্গ কিঃ মিঃ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এ হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহওম মিঠা পানির জলাভূমি । ছোট বড় প্রায় ১২০ টি বিল রয়েছে এ হাওরে । স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি-নয় কুড়ি কান্দায় ছয় কুড়ি বিল নামে ও পরিচিতি । এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান, প্রথমটি সুন্দরবন।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধর্ম পাশা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এর অবস্থান। পরিযায়ি পাখি আর মাছের অভয়ারন্য বিস্তীর্ণ এ জলাশয়। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০(ত্রিশ) টির ও বেশি ঝরা / ঝর্না) এসে মিশেছে এই হাওরের সমন্বয়ে ৯,৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাংগুয়ার হাওর জেলায় সবচেয়ে বড় জলা ভূমি। বর্ষা কালে হাওরটির আয়তন দাড়ায় প্রায় ২০ (বিশ) হাজার একর।
বাংলাদেশে পাখিদের এক স্বর্গরাজ্য টাক্সগুয়ার হাওর। শীতের শুরু থেকে শেষ অবধি এ হাওরে বসে পাখিদের মিলন মেলা। আর এসব পাখির বেশির ভাগই পরিযায়ী। প্রতি বছর সাইবেরিয়া থেকে এ হাওরে প্রায় ২০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৫০ প্রজাতির পাখি রয়েছে এখানে। বিলুপ্ত প্রায় প্যালাসেস ঈগল, বৃহদাকার গ্রে-কিংষ্টক, শকুন এবং বিপুল সংখ্যক অথিতি পাখি টাক্সগুয়ার হাওরের অবিস্মরণীয় দৃশ্য। শীতে টাক্সগুয়ার হাওরে যেসব পাখি বেশি দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- পান-কৌড়ি, খোপা ডুবুরি (ছোট/ বড়), ধুপনি বক, বেগুনি বক, সারস, চখাচখি, সরালি (ছোট/ বড়) , লেনজা, বালি হাঁস, পাতি হাঁস, মেটে রাজহাঁস , খুনতে হাঁস, পাটারি হাঁস, ফুলুরি হাঁস , পান্তা ঝিলি , মেটে বুক ঝিলি, জল মোরগ, লাল বুক গুরগুরি, নেউ পিপি, দল পিপি, মেটে মাথা টিটি, বিল বাটান ,সোনালি বাটান, গাঙচিল, ডাহুক, কুঁড়া, বড় চিত্রা ঈগল, তিলা নাগ ঈগল ইত্যাদি ।
টাক্সগুয়ার হাওরের পাখিদের প্রধান দুটি অভয়ারণ্য হল লেউচ্ছামারাও বেরবেড়িয়ার বিল। এ ছাড়াও যে বিলগুলোতে পাখিদের আনাগোনা বেশি থাকে সে গুলো হল- রউয়ার বিল, গজারিয়ার বিল, আলমের ডোয়ার , কৈখালি বিল, ছুনখোলা বিল , ফইন্নার বিল, রুপাভুই বিল, সত্তার বিল, মইষের গাতা, বালোয়ার ডোবা, আমছারের বিল, কাউয়ার বিল, খাজুবী বিল, আইন্নার বিল, নল-কাঠির বিল, ইত্যাদি। টাক্সগুয়ার হাওরের ঠিক মাঝখানটায় সুন্দও বিল হাতির গাতা। এর চারপাশে রয়েছে অন্য বিলগুলো। শীতকালে হাতির গাতার বেশির ভাগ এলাকাই শুকিয়ে যায়। কথিত আছে ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজরা শুকিয়ে যাওয়া মাঠে হাতি চড়াতে আসতেন বলেই এর নামকরণ হয়েছে হাতির গাতা।
টাক্সগুয়ার হাওর প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ। এ হাওর শুধু একটি জলমহাল বা মাছ প্রতিপালন , সংরক্ষণ ও আহরণেরই স্থান নয়। এটি একটি মাদার কিশারি । প্রায় ২০০ (দু শ) প্রজাতির মাছ , ব্যাঙ, সাপ, কচ্ছপ-কাছিমসহ নানা প্রকার উভয়চর প্রাণী রয়েছে টাক্সগুয়ার হাওরে । এখানে রয়েছে ১৪০ (একশ চল্লিশ) টির ও বেশি প্রজাতির মিঠা পানির মাছ । এ গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – রুই, কাতলা, আইড়, বোয়াল, গাংমাগুর, বাইম, তারা বাইম, গুলশা, গুতুম, টেংরা, তিতনা, গজার, গরিয়া বেতি, কাকিয়া, ইত্যাদি। এ হাওরের রুই মাছের স্বাদ অপূর্ব। তবে টাংগুয়ার হাওরের বিখ্যাত মাছের মধ্যে মহাশোল মাছ ও উল্লেখযোগ্য।
অনিন্দসুন্দর টাংগুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক রূপা পুরো হাওর গাছের সীমানা দিয়ে ঘেরা । হিমল করচের দৃষ্টিনন্দর সারি এ হাওরকে করেছে মোহনিয়া এছাড়া ও নল-খাগড়া , দুধিলতা, নীল-শাপলা, পানিফল, শোলা, হেলেঞ্চা , শতমূলি, শীতলপাটি, স্বর্ণলতা, বনতুলসী, বরুন, বল্লুয়া, চাল্লিয়া, ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদসহ প্রায় ২০০ (দু শ) প্রজাতির ও বেশি গাছ- গাছালী রয়েছে এ প্রতিবেশ অঞ্চলে। এখানে টলমলে জল আঁকাশের রং চুরি করে নিত্য খেলা করে, পাহাড়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ে সাদা মেঘের দল। এখানে সূর্য একরাশা হাসি নিয়ে জেগে উঠে পাহাড়ের বুক চিরে , চাঁদ এসে জলের আয়নায় তার রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে থমকে দাড়ায়। ঢেউয়ের কোলে দুলতে দুলতে ঘুমিয়ে পড়ে তারার সারি । এটা কল্পনা নয়, সত্যিই যেন, মর্তের মাঝে স্বর্গের হাতছানি। মেঘমালা এখানে অনেক নীচ দিয়ে উড়ে যায়, দূর থেকে দেখে মনে হয় পানিতে যেন ভাসছে মেঘের ভেলা। সাহিত্যের কোন ভাষা, কোন উপমা দিয়ে যে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। স্বচ্ছ টলমলে মলে নীচে দেখা যায় গাছ, ঘাস আর লতাপাতার বসতি, যেন জীবন্ত কোন অ্যাকুরিয়াম। এক একসময় গাছ , মাছ, পাখি আর প্রাকৃতিক, জীব-বৈচিত্রের আধার ছিল এই হাওর। ১৯৯৯ কিঃ টাংগুয়ার হাওরকে ;প্রতিবেশ-গত সংকটাপন্ন এলাকা; হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আর তখনই অবসান ঘটে দীর্ঘ দিনের ইজারাদারির। ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি টাক্সগুয়ার হাওরকে; রামসার সাইট; হিসেবে ঘোষণা করা হয় (১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরের নামানুসারে)। হাওর এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, স¤পদ সংরক্কন ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষে বাংলাদেশ ও সূইজারল্যান্ড সরকারের মধ্যে ২০০১ সালের ১২ ফেব্র“য়ারি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০০৩ সালের ৯ নভেম্বর থেকে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা-প্রশাসন ।
ইতিহাসে আছে প্রাচীনকালে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং সিলেট জেলার কিয়দংশ এবং নেত্রকোনা জেলার কিছু অংশ ছিল কালিদহ সাগর। উজান থেকে আসা পলি সঞ্চয়নসহ হাজার বছরের প্রাকৃতিক বিবর্তনের কারণে ভুমি এবং ছোট ছোট বিল-ঝিল, হাওর-বাওর, কান্দা, গাছ, জলজগাছ, মাছ ও পাখিসহ অন্যান্য প্রাণীর সমাহার টাক্সগুয়ার হাওরকে দিয়েছে বিচিত্র রূপ, অপরূপ সৌন্দর্য, জীব-বৈচিত্র এবং নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক লীলাভূমি হওয়ার যোগ্যতা। খাগড়াছড়ির সাজেক ভ্যালি, সিলেটের বিছনাকান্দি, জাফলং, শিলং-এর পাহাড় আর মেঘের খেলা সব যেন একটি ফ্রেমে বন্দী হয়েছে তাহিরপুরের টাক্সগুয়ার হাওরে ।

লেখক ঃ সহকারি অধ্যাপক, ইছামতি ডিগ্রী কলেজ, জকিগঞ্জ, সিলেট।

সর্বশেষ সংবাদ