মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৪ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

নির্বাচনকালিন সহিংসতা বন্ধে দায় কার? সুমন ঘোষ

 

42777360_360698771410601_8462100207604072448_nএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে  আসতে তত নির্বাচনী ইমেজ বৃদ্ধি পাচ্ছে, রাজনৈতিক দল গুলো নতুন নতুন ইশতেহার দিচ্ছেন। ১৯৭১ সালে জন্ম নেওয়া জাতীয়তাবাদ,সমাজতন্ত্র,গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, নিয়ে গঠিত স্বাধীন সার্বভৌম  বাংলাদেশ । গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার জনগণেই সকল কথার উৎস এবং জনগণের  নির্বাচিত প্রতিনিধিইরাই জাতীয় সংসদে জনগণের স্বার্থে কাজ করেন ও ভোটের প্রতিফলন হয় সংসদে গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের সরকার গঠনের মধ্যে দিয়ে, তাই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একমাত্র  জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে এদেশের জনগণ তাহাদের স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটায়, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ইশতেহারের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিকে তার ধৈর্য, পরিশ্রম, উদ্যোগী, সততা জনগণের জানমাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জনপ্রতিনিধি জবাবদিহি ও ধর্ম বর্ণ নারী- পুরুষভেদে এবং সকল নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না এমন প্রার্থীকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশ থেকে বাংলাদেশ মধ্যআয়ের পরিনত হতে বদ্ধপরিকর। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান যেখানে অনুচ্ছেদ ২৮ (১) কেবল ধর্ম,গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। (২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। কিন্তু বিগত নির্বাচনগুলোতে নির্বাচনীকালিন সময়  এবং এর পরিবর্তিত সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন পরিলক্ষিত।
রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা পালা বদলের সাথে সাথে কিছু সাম্প্রদায়িকনীতি দৃশ্যমান হয়ে উঠে। এগুলো  রাজনৈতিক ইশতেহারে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের কোনো করণীয় লক্ষ্য করা যায়নি। নির্বাচনীকালিন সময় জনগণের জানমাল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি, ধর্ম, উপাসনালয়  সহ নারী-পুরুষের সার্বিক নিরাপত্তা নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনের পরিবর্তিত সময় গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের সরকারের হেফাজতে রাখা কর্তব্য কিন্তু  নির্বাচনীকালিন  সহিংসতায় নির্বাচনী নীতিমালা পর্যাপ্ত নয়, এর জন্য নির্বাচনকালিন সময় সহিংসতা  বৃদ্ধি পায়। নির্বাচনী নীতিমালা ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮,, ১১নং  উস্কানিমূলক বক্তব্য বা বিবৃতি প্রদান,উচ্ছংখল আচরণ এবং বিস্ফোরক বহন সংক্রান্ত বাধা। কোনো নিবন্ধিত  রাজনৈতিক দল কিংবা উহার মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাহাদের পক্ষে  অন্য কোন  ব্যক্তি…………..
(ক) নির্বাচনী প্রচারণাকালে ব্যক্তি গত চরিত্র হনন করিয়া বক্তব্য প্রদান বা কোন ধরনের তিক্ত বা উস্কানিমূলক কিংবা সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোন বক্তব্য প্রদান করিতে পারিবেন না।
(খ) মসজিদ, মন্দির, গির্জা, বা অন্য কোন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কোন প্রকার নির্বাচনী প্রচারণা চালাইতে পারিবেন না।
(গ) নির্বাচনী উপলক্ষে কোন নাগরিকের জমি, ভবন, বা অন্য কোন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি কোনরূপ ক্ষতি সাধন করা যাইবে না এবং অনভিপ্রেত গোলযোগে ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ দ্বারা কাহার ও শান্তি ভঙ্গ করিতে পারিবেন না এবং নির্যাতনী নীতিমালায়  এই অপরাধটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
১৮নং বিধিমালার বিধান লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ (১) কোন প্রার্থী বা তাহার পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি নির্বাচনপূর্ব সময়ের  এই বিধিমান কর কোন বিধান লঙ্ঘন করিলে অনধিক ছয়মাসের কারাদন্ড অথবা পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড  অথবা উভয় দন্ডে দণ্ডনীয় হইবেন । (২) কেন নিবন্ধক রাজনৈতিক দল নির্বাচন পূর্ব এই বিধিমালার কেন বিধান লঙ্ঘন করিলে অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবে।
এই আইনকি সহিংসতা রোধে পর্যাপ্ত ???
নির্বাচনীকালিন পরিবর্তিত সহিংসতা অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার করা হবে। সেক্ষেত্রে জনগণের জানমাল নিরাপত্তা নিশ্চিত কারি সরকারের মূখ্য ভূমিকা প্রয়োজন। কেননা সংখ্যালঘু নির্যাতন বার বার পুণরাভিত্তিই উল্লেখ করে দিচ্ছে, সংখ্যালঘু সহ ভিকটিম এর নির্যাতন দমনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধী  সামনে উঠে আসলেও  নির্যাতনের মূলহোতা সবসময়েই ধরাধরি বাহিরে থেকে যায় যার ফলে নির্যাতন পুর্ণরাভিত্তি । বাংলাদেশের সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রি.জে.জে. (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ভোরের কাগজ পত্রিকার সাথে  এক সাক্ষাৎকারে : সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় কী কী রয়েছে বলে আপনি মনে করেন? এই  প্রসংঙ্গে বলেন: সুষ্ঠু নির্বাচনের সব চেয়ে বড় অন্তরায় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাব। তারা ভাবে না ভোটে হারজিত হবেই- কেউ জিতবেন, কেউ হারবেন। তবে এখানে দেখা যায়, দল যদি নির্বাচনে হেরে যায় বা হারার সম্ভাবনা রয়েছে দেখে তখনই গণ্ডগোল পাকাতে চায়, জোর করে বুথ দখল, জাল ভোট দেয়ার চেষ্টা করে, কোনো কোনো নির্বাচনে তো ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে, বাক্স ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এগুলো প্রায়ই দেখা যায়। তাই সবার আগে দরকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা বাড়ানো। দলগুলোর নিয়মিত কাউন্সিল করা, দলে গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়ানো, দলের কেন্দ্রীয়ভাবে স্থানীয় বা মাঠ পর্যায়ের কমিটিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো- এসব বিশেষ প্রয়োজন। তাছাড়া দলগুলোর নিজেদের মধ্যে সহমর্মিতা বা সম্মান প্রদর্শন, একে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এগুলো থাকা দরকার। এর পরে দেখা যায় কোনো কোনো স্থানে প্রশাসনেরও দলীয়করণ হয়ে যায়।
তারা কোনো বিশেষ প্রার্থীর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে, কারো হয়ে কাজ করে বা নিশ্চুপ থাকে। সেই সুযোগে কোনো প্রার্থীর কর্মীরা ভোটে কারচুপি বা গণ্ডগোলের সুযোগ নেয়। তাই এসব ব্যাপারে ইসির কড়া নির্দেশনা থাকা বিশেষ প্রয়োজন। এছাড়া নির্বাচনী মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা হলে দোষীরা দ্রুত শাস্তি পায়, তাহলে কিছুটা হলেও নির্বাচনী সহিংসতা বা গণ্ডগোল কমতে বাধ্য। তাই বলা চলে ইসির একার পক্ষে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব হবে না যদি দলগুলো তাকে সহযোগিতা না করে। এখানে দল, প্রার্থী, ভোটার, প্রশাসন, কর্মকর্তা সবার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনীকালিন ও পরিবর্তিত সময়ে দেশের আমজনতার উপর নির্যাতন বন্ধে করণীয় :- নির্বাচন কমিশনারের  একার পক্ষে নির্বাচনকালিন সময়ে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনীকালিন সহিংসতা ও সংখ্যালঘু সহ আমজনতার  নির্যাতন বন্ধে নির্বাচনী ইশতেহারের ও নীতিমালায় মনোনয়ন জমা দানকারী যে সকল প্রতিনিধি সংখ্যালঘু নির্যাতন সহ সহিংসতাকারীকে মনোনয়ন বাতিল এবং নির্যাতন ও সহিংসতার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা হলে দোষীরা দ্রুত শাস্তি আওতায় আনতে পারলে কিছুটা হলেও নির্বাচনী সহিংসতা বা গণ্ডগোল কমতে বাধ্য। তাই বলা চলে ইসির একার পক্ষে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব হবে না যদি দলগুলো তাকে সহযোগিতা না করে তবে এই সহিংসতা মাত্রা বৃদ্ধি পাবে ও পরবর্তী সময় তা হবে রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ । এখানে দল, প্রার্থী, ভোটার, প্রশাসন, কর্মকর্তা সবার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্বাচিত সরকার নির্বাচিত সময় সহ পরিবর্তিত সহিংসতা রোধে পর্যাপ্ত আইন পার্লামেন্ট পাশ করা প্রয়োজন পাশাপাশি নির্বাচনকালিন মিটিং সেমিনার গুলোতে অথবা পাবলিক স্থানে নির্বাচনকালিন সহিংসতা রোধে সচেতন মূলক পোস্টার নিউজ চ্যানেলে প্রচার করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে  কিছুটা হলেও নির্বাচনী সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে ।

২৮ ব্যাচ,এল এল.বি.(অনার্স)
আইন ও বিচার বিভাগ
মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি,সিলেট।

সর্বশেষ সংবাদ