বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য মনিপুরী তাঁত শিল্পই যখন মনিপুরীদের সম্ভাবনার পথিকৃত

imagesজীবন পাল, শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে বাস করে এ দেশের অন্যতম নৃ-গোষ্ঠী মণিপুরী সম্প্রদায়। আঠারো শ’ শতক থেকে এই এলাকায় মণিপুরীদের বাস। এ দেশে প্রায় দেড় লাখ মণিপুরী বসবাস করে। মণিপুরী নারীদের সুখ্যাতি রয়েছে হাতে বোনা তাঁতের কাপড়ের জন্য। শ্রীমঙ্গল ও বিশেষ করে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের প্রায় ৬০টি গ্রাম বিখ্যাত মণিপুরী তাঁতশিল্পের জন্য । বাংলাদেশের প্রাচীন হস্তশিল্পগুলোর মধ্যে মনিপুরী হস্তশিল্প সু-প্রসিদ্ধ । মনিপুরী হস্তশিল্প অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত । তাঁত শিল্পের সঙ্গে মনিপুরীদের রয়েছে যুগযুগান্তরের সম্পর্ক মনিপুরী সমাজে মেয়েদের তাঁত শিল্পের অভিজ্ঞতাকে বিয়ের ক্ষেত্রে পূর্বযোগ্যতা হিসেবে দেখা হয় ।
যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে আধুনিকতার ছোঁযায় বাংলাােদশের অনেক ঐতিহ্যই এখন বিলুপ্তির পথে কিন্তু শ্রীমঙ্গলের রামনগর এলাকার মনিপুরী সম্প্রদায় তাদেও ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে সম্ভাবনার পথ প্রদর্শক হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। শুধু যে ঐতিহ্যকে ধওে রেখেছে তা কিন্তু নয়, এরা নিজেদের তৈরি প্রাচীন এই শিল্পকে বাচিয়ে রাখতে এখন নিজেদেও তৈরি পোশাক নিজেদেও গড়ে তোলা মার্কেটে সুনিপুন ভাবে সাজিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে বিক্রিকওে ব্যবসার বাজাওে নিজেদেও তৈরি পোশাকের মান ও চাহিদা দুটোইধওে রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
বর্তমানে রামনগর মনিপুরী পাড়ায় ৬৫ মানিপুরি পরিবার বসবাস রয়েছে। যাদেও ১০০% মহিলারায় মনিপুরী তাঁত শিল্পের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। আর সেই সব তৈরি পোশাক বর্তমানে অন্যত্র বিক্রির জন্য না নিয়ে মনিপুরী ছেলেরা নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলেছেন একের পর এক মার্কেট। যেখানে ঐ এলাকার অতীতে মনিপুরীদেও একটি মুদি দোকান ছিলনা সেখানে বর্তমানে মনিপুরীদেও মার্কেট রয়েছে ৮ টি। যে সব মার্কেট গুলোতে বিক্রি করা হচ্ছে তাদেও মহিলাদেও তৈরি পোশাক। এলাকাটি চা-বাগান সংলগ্ন হওয়ায় আগত পর্যটকরায় হয়ে থাকে ঐসব মার্কেটের দোকানগুলোর প্রধান ক্রেতা। যার কারনে প্রতিদিনই এই এলাকার এইসব মার্কেটগুলোতে থাকে ক্রেতাদের ভীড় চোখে পড়ার মত।
মনিপুরীদের বস্ত্র তৈরির তাঁতকল বা মেশিন প্রধানত তিন প্রকার যেমন, কোমরে বাঁধা তাঁত, হ্যান্ডলুম তাঁত ও থোয়াং। এই তাঁতগুলো দিয়ে সাধারণত টেবিল ক্লথ, স্কার্ফ, লেডিস চাদর, শাড়ি, তোয়ালে, মাফলার, গামছা, মশারী, ইত্যাদি ছোট কাপড় তৈরি হয়। প্রধানত নিজেদের তৈরি পোশাক দ্বারা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতেই মনিপুরী সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁত শিল্প গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে তাঁত শিল্পে নির্মিত সামগ্রী বাঙালি সমাজে নন্দিত ও ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে নকশা করা ১২ হাত মনিপুরী শাড়ি, নকশি ওড়না, মনোহারী ডিজাইনের শীতের চাদর বাঙালি মহিলাদের সৌখিন পরিধেয়।
চাকমা তাতিদের মতো মনিপুরী তাঁতিদেরও তাঁতে কাপড় বুননের জন্য নিজস্ব তাঁত আছে। তাঁতে বুনন পদ্ধতিটা মোটামুটি চাকমাদের বুনন পদ্ধতির মতই । তাঁতে ব্যবহৃত উপাদান গুলোর নাম ও কাপড়ে তোলা নকসার ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় । সূতা তাঁতের সাথে বাঁধা হয়ে গেলে তাঁতি বুনন করতে বসে পড়েন তার পিঠে তাঁতের সাথে সাটানো চামড়ার ব্যকস্ট্রিপটা পিঠে আটকে নেন । বুনন করার জন্য বুননকারী তাঁতের দৈর্ঘ্য বরাবর আটকানো সুতাগুলোকে উপর নিচে চালাতে থাকে নাচাই বা বয়ার নেসির মাধ্যমে; এগুলো এক ধরণের এবং শেড নামের এক ধরণের স্পেস তৈরি করতে সাহায্য করে ।পরে শেডের মধ্যে উল্লম্ব বরাবর বেং বা টেয়াম স্থাপন করা হয় । পরবর্তীতে বুননকারী শেডের ভেতর দিয়ে একটা সাঁটল ঢুকিয়ে দেয় । এরপর তাঁতি বেং বা টেয়াম চ্যাপ্টা প্রান্ত ব্যবহার করে বুনন করা কাপড়ের বিপরীত দিকে প্রস্থ বরাবর স্তাহপ্ন করা সূতাগুলোকে ধাক্কা বা বাড়ি দিতে থাকে । এসময় বেং বা টেয়াম বের করে নেয়া হয় । এবংে র পরিবর্তে উটোং ব্যবহার করা হয় সুতাগুলোকে বিপরীত দিকে নেয়ার জন্য ।
রে বেং বা টেয়াম কে আবার শেডের মধ্যে উলম্ব বরাবর প্রতিস্থাপন করা হয় এবং বাম থেকে ডান দিকে একটা সাঁটল ঢুকানো হয় । জনপ্রিয় মনিপুরী ডিজাইন হচ্ছে ঝাউ গাছ, সেফালি ফুল, এবং মন্দিরের নকসা; এই নকসা মইরাং ফি নামে পরিচিত । রাজকুমারি মইরাং থইবি নাম অনুসারে এই নামকরণ হয়েছে ।তাঁতে কাপড়ে নকসা তোলার জন্য তাঁতি এক ধরণের সুচালো যন্ত্র ব্যবহার করে জামদানীর ক্ষেত্রে । কি ধরণের কাপড় বুনা হবে টা অনেক সময় স্থানীয় আবহাওয়ার উপরও নির্ভর করে । যেমন তিলকপুরের তাঁতিরা শীতকালে কাপড় বুনার জন্য উল ও পলিয়েস্টারের সূতা ব্যবহার করে অন্যদিকা গ্রীষ্মকালে তুলার সূতা ব্যবহার করে ফানেক,গামছা ও ফিদু তৈরির জন্য । সাধারণত তারা তুলা ত্রিপুরা সম্প্রদায় থেকে সংগ্রহ করতো । তবে বর্তমানে বাজার থেকে সুতি সূতা ক্রয় করে । মনিপুরীদের তৈরি ফানেক খুব আকর্ষণীয় উজ্জলও বিপরীতমুখী রং ব্যবহার করা হয় শরীরের অংশে আর বর্ডারের । প্রতিদিন পড়ার কাপড়ে তারা সমতল পাড়ের কাপড় তৈরি করে । কিন্তু বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি কাপড়ে “টেম্পল মোটিফ” বুনন করে ।
তবে অনেক মনিপুরী তাঁতিই জানান যে ব্যাক স্ট্রিপ কাজ অনেক কষ্টসাধ্য এবং এতে বেশি সময় ব্যয় হয় । কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাড়িতে নকসা তলার সময় মনিপুরীরা কম সূতা ব্যবহার করে গাথুনি বেশ পাতলা রাখে । বাঙালী মহিলারা একে “মশার জাল” বলে। অতীতে মনিপুরীরা আরও অনেক ধরণের দিজাইনে কাপড় তৈরি করতো যেমন কানাপ,খান্মেন চাতপা, সাথকাপা ফি অবশ্য এগুলো তেমন এখন দেখা যায় না । এগুলো নকাশা তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে তাঁতিরা । বর্তমানে মনিপুরীরা নিজেদের ব্যবহার ও বাজার বিক্রয়ের জন্য তৈরি কাপড়ে কিছুটা সহজ প্রকৃতির নকশা তোলে ।

সর্বশেষ সংবাদ